টাকার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। দেড় বছর আগে যে পণ্য আমদানি করতে ১০০ টাকা লাগত, এখন তার জন্য ১২০ টাকা বা তারও বেশি গুনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ বিভাগের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার, ইউরো, পাউন্ড এবং চীনা ইউয়ানের বিপরীতে টাকার রেকর্ড পতন হয়েছে। এই মুদ্রার অবমূল্যায়ন দেশের অর্থনীতিকে এক জটিল ফাঁদে ফেলেছে, যার সরাসরি মাশুল দিচ্ছে সাধারণ ভোক্তা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রতি মার্কিন ডলারের আনুষ্ঠানিক মূল্য ছিল ১১০ টাকা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রতি ডলারের বিনিময় হার গিয়ে ১২২ টাকায় ঠেকে। মাত্র দেড় বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার ক্ষমতা কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। গত দেড় বছরে ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরো এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। আর চীনা মুদ্রা ইউয়ানের বিপরীতে টাকার মান কমেছে রেকর্ড পরিমাণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টাকার দাম কমায় সাময়িকভাবে রপ্তানিকারকরা সুবিধা পেলেও দেশের ভিতর মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সেই সুবিধা উধাও হয়ে গেছে। টাকার এই অবমূল্যায়নের ফলে দেশের প্রধান ৫টি খাত এখন চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। উৎপাদন ও শিল্প খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ফলে কারখানার উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল, গম ও ডালের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়ায় দেশে ‘আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি’ তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ডলারের দাম বাড়ায় সরকারের বিদেশি ঋণ ও সুদের কিস্তি পরিশোধের খরচ বহুগুণ বেড়েছে। বাড়তি আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং ডলারের বাজার ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনবরত রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি হয়েছে।
ইউয়ানের বিপরীতে টাকার মান কমায় চ্যালেঞ্জ বাড়ছে : ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমায় অর্থনীতিতে যে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়, ইউয়ানের বিপরীতে টাকার মান কমায় তারচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে বলে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয় স্বীকার করছে। অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউয়ানের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্যের ‘ল্যান্ডিং কস্ট’ বা প্রকৃতি আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থায় উৎপাদন ব্যয়ের চাপ আরও তীব্র হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনা মুদ্রা ইউয়ানের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মান কমে যাওয়ার অর্থ হলো চীন থেকে পণ্য আমদানির খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া, কারণ বাংলাদেশের মোট আমদানির সবচেয়ে বড় অংশটি আসে চীন থেকে। চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই সীমিত, কিন্তু আমদানি বিশাল। ইউয়ানের বিপরীতে টাকার মান কমায় এই দুই দেশের মধ্যকার সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশের নিট পোশাক রপ্তানি খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের পোশাক শিল্পসহ সিংহভাগ কারখানার কাঁচামাল আসে চীন থেকে। চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’র বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় চীন থেকে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে গেছে। শুধু তাই নয়, সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহার্য ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রপাতি, কাপড় এবং বিভিন্ন কেমিক্যাল ও প্লাস্টিক পণ্য চীন থেকে আমদানি করা হয়। আমদানিকারকদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়ছে, যা সরাসরি সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ ফেলছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের ওপর চাপ কমাতে ইউয়ানে এলসি খোলার যে বিকল্প সুবিধা চালু করেছিল, টাকার বিপরীতে ইউয়ান শক্তিশালী হতে থাকায় আমদানিকারকরা ইউয়ানে লেনদেন করতে আগের চেয়ে কম লাভবান বা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ বা কর্ণফুলী টানেলের মতো চীনের অর্থায়নে পরিচালিত বড় বড় মেগা প্রকল্পের বিপরীতে নেওয়া ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের খরচ টাকার অঙ্কে অনেক বেড়ে যাচ্ছে।