Image description

রাজপথের ছাত্ররাজনীতি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রফেসর ড. আসিফ মিজান বর্তমানে সোমালিয়াভিত্তিক দারু সালাম ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য। পুলিশ ম্যানেজমেন্ট ও ক্রিমিনোলজিতে উচ্চতর ডিগ্রিধারী তিনি শিক্ষা, গবেষণা ও নিরাপত্তাবিষয়ক কাজের সঙ্গে যুক্ত। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপন-এ। কথা বলেন প্রবাস জীবন, শিক্ষা ও গবেষণা, আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং দেশের সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

 

এশিয়া পোস্ট: আপনি একসময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, সেখান থেকে আজ আফ্রিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে এসেছেন। এই যাত্রা আপনার কাছে কেমন ছিল?

 

ড. আসিফ মিজান: রাজপথ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার এই যাত্রাটি আসলে সুখে-দুঃখে মিলেমিশে একাকার। তবে আমি সবসময় এই পথচলা উপভোগ করেছি। আপনি নিশ্চয়ই সেই গানটি শুনেছেন—‘যদি ইচ্ছে থাকে অটুট, তবে এক দিন জয় আসবে’। আমার মনে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ আমাকে যে প্রতিষ্ঠানেই যুক্ত করুন না কেন, আমি যেন তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারি। ছাত্রজীবনে আমার স্বপ্ন ছিল হয় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবো, না হয় একজন আইনজীবী বা ব্যারিস্টার হবো। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার প্রথম ইচ্ছাটিই কবুল করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ার আর রাজপথের লড়াই—এই দুটি গন্তব্য সাধারণত একই মানুষের জীবনে মেলে না, তবে আমার ক্ষেত্রে আল্লাহ সেই সুযোগ করে দিয়েছেন।

 

এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনীতির শুরুর গল্প জানতে চাই। কখন এবং কীভাবে আপনি এই আদর্শের সঙ্গে যুক্ত হলেন?

 

ড. আসিফ মিজান: আমাদের পরিবার ঐতিহাসিকভাবেই একটি ঐতিহ্যবাহী এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শের পরিবার। আমি যখন হাইস্কুলে পড়ি, তখনই আমাদের উপজেলা ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ আমাকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। আমি তখন মাত্র অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, অথচ আমাকে তারা সভাপতি বানিয়েছিলেন। বিষয়টি তৎকালীন ‘দক্ষিণাঞ্চল’ পত্রিকায় বেশ গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্টও হয়েছিল। সেই যে পথচলা শুরু, তারপর থেকেই একজন সচেতন জাতীয়তাবাদী কর্মী হিসেবে দলের সঙ্গে আছি এবং কাজ করে যাচ্ছি। কখনো রাজপথে সরব থেকেছি, আবার কখনো নীরবে-নিভৃতে যখনই প্রয়োজন হয়েছে, ছুটে গিয়েছি।

 

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতিবিদ না হয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতাকে বেছে নিলেন কেন?

 

ড. আসিফ মিজান: এখনও যখন আমার সেই পুরোনো দিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা বা কাছের ভাই-বোনেরা বলেন যে, তারা আমাকে একজন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, তখন খুব ভালো লাগে। তাদের স্বপ্ন ছিল আমি যেন পুরোপুরি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের জীবন গড়ে তুলি। সত্যি বলতে, আমারও যে সেই ইচ্ছা ছিল না তা নয়। তবে আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন, তাই আমার অবচেতনে শিক্ষকতার প্রতি একটা টান ছিল। আমার মনে সবসময় প্রশ্ন জাগত, কীভাবে আমি দেশ ও মানুষের সেবা করতে পারি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমার মনে হয়েছিল, ব্যারিস্টার হতে পারলে যেমন মানুষকে আইনি সেবা দেওয়া যায়, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারলে পলিসি মেকিংয়ে সম্পৃক্ত হওয়া এবং মানুষের মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে তাদের গড়ে তোলার সুযোগ থাকে।

 

এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতির সময়কার কোন বিশেষ ঘটনা এখনও আপনার বেশি মনে পড়ে?

 

ড. আসিফ মিজান: হাইস্কুলে পড়ার সময়ের একটি মজার কিন্তু ভীতি জাগানিয়া স্মৃতি খুব মনে পড়ে। আমাদের একজন ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন, যাকে আমরা সবাই যমদূতের মতো ভয় পেতাম। হঠাৎ এক দিন স্কুলে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো যেখানে উপজেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মী আসলেন। সেই সভায় আমি ছিলাম সভাপতি, আর আমার সেই প্রিয় ও ভীতি জাগানিয়া স্যার ছিলেন প্রধান অতিথি। যার সামনে কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাহস পাইনি, সেই স্যারের পাশে আমাকে সভাপতি হিসেবে বসতে হয়েছিল। বিষয়টি যেমন ভালো লাগার ছিল, তেমনি প্রচণ্ড ভয়েরও ছিল। কিছুদিন আগে আমাদের নেতা তারেক রহমান যেমন বলেছিলেন—তার চেয়ারটি আগুনের চেয়ার, সেদিন আমার কাছেও মনে হয়েছিল আমি যেন আগুনের ওপর বসে আছি। এটি আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতি।

 

এশিয়া পোস্ট: ঢাকার রাজপথের সংগ্রামের কোনো নির্দিষ্ট স্মৃতি আপনার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে?

 

ড. আসিফ মিজান: ঢাকায় আসার পর একজন পরিপক্ক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে অসংখ্য লড়াই-সংগ্রামে অংশ নিয়েছি। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে মানিক মিয়া এভিনিউতে বিএনপির সেই বিশাল জনসভার কথা কখনো ভুলব না। তখন আজকের মতো ডিভাইডার ছিল না, পুরো রাস্তা খোলা ছিল। সভা শেষে যখন গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহর সভাস্থল ত্যাগ করছিল, তখন আমি গাড়ির একদম সামনে থেকে ভিড় ঠেলে রাস্তা করে দিচ্ছিলাম। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে একপর্যায়ে আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং গাড়ির ইঞ্জিনের ওপরের অংশে (বনেট) বসে পড়ি। আমি সেই মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট পর্যন্ত গাড়ির সামনে এভাবেই গিয়েছিলাম। ওই সময় আমার আশপাশে থাকা অনেক নেতা আজ হয়তো সাবেক মন্ত্রী বা এমপি। আপনাদের মিডিয়ার মাধ্যমে আমি আবেদন রাখব, যদি ওই সময়ের কোনো ভিডিও বা ছবি কারও কাছে থাকে, তবে আমি তা পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি।

 

এশিয়া পোস্ট: ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আপনি দেশ ছাড়েন। এর প্রেক্ষাপট আসলে কী ছিল?

 

ড. আসিফ মিজান: এটি একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং স্পর্শকাতর বিষয়। ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি আমি দেশ ছাড়ি। আসলে এই যাওয়াটা ছিল সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। হঠাৎ করেই আমার কাছে একটি অজ্ঞাত হুমকি আসে যে, আমাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে হবে। আজ আমি এই সত্যটি বলতে বাধ্য হচ্ছি, যা এতদিন আমার পরিবার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীরাও জানতেন না। আমি বিষয়টি গোপন রেখেছিলাম এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলাম আমাকে যেন দ্রুত রিলিজ দেওয়া হয়। এমনকি আমার এলাকায় আমাকে অপহরণের চেষ্টাও করা হয়েছিল, যা নিয়ে পত্রিকায় সংবাদও হয়েছিল। আল্লাহ আমাকে সেবার রক্ষা করেছিলেন।

 

এশিয়া পোস্ট: এই হুমকির সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল? কেন আপনাকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হলো?

 

ড. আসিফ মিজান: আমি তখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বিভাগীয় প্রধান ছিলাম। আমার রুমে আমি নিয়মিত নামাজ পড়তাম এবং অনেক সহকর্মীও নামাজ পড়তে আসতেন। সেটি এক প্রকার প্রেয়ার রুম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। ফলে সেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙানো ছিল না। এই ছবি না টাঙানোকেই কেন্দ্র করে ঝামেলার সূত্রপাত হয়। তৎকালীন সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাই আমার সাবঅর্ডিনেট ছিলেন, যিনি বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি তার সরকারি প্রভাব প্রয়োগ করে আমাকে সরকারবিরোধী ট্যাগ দিয়ে হয়রানি শুরু করেন। তিনি সরাসরি হুমকি দেন যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে দেশ ছাড়তে হবে। আমি কোনো আতঙ্ক ছড়াতে চাইনি বলে দ্রুত চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক স্যার আমাকে প্রথমে ছুটিতে যেতে বললেও পরিস্থিতি বুঝে তিনি তিন দিনের মধ্যে আমার সব পাওনা পরিশোধ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান।

এশিয়া পোস্ট: বিদেশের কর্মক্ষেত্রে আপনার রাজনৈতিক পরিচয় কি কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলেছে?

 

ড. আসিফ মিজান: আমি মনে করি, আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকি, তখন আমি শুধুই একজন শিক্ষক। কিন্তু প্রতিপক্ষ যেহেতু জানত আমি জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী, তাই তারা বিদেশেও আমাকে ডিস্টার্ব করার চেষ্টা করেছে। তারা সোমালিয়ার সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে মেইল করে আমার বিরুদ্ধে কুৎসিত প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। এমনকি আমাকে ‘এটিএম কার্ড জালিয়াতি’ চক্রের সদস্য হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার মেধা ও আচরণ দেখে বুঝেছিল এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। তারা উল্টো অবাক হতো যে, নিজ দেশের একজন প্রফেসরের বিরুদ্ধে তার দেশের মানুষই কীভাবে এমন জঘন্য মিথ্যাচার করতে পারে।

 

এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে আপনি বিদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। প্রবাসে থেকে দেশের রাজনীতির সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা কেমন?

 

ড. আসিফ মিজান: আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির কোনো পদে আমি নেই, তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে আমি দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছি। সোমালিয়া একটি আরব দেশ এবং সেখানকার রাজনীতি ও আইন বেশ কঠিন, বিশেষ করে বিদেশিদের জন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই আমি সশরীরে অ্যাক্টিভিটিজে না গিয়েও একজন একাডেমিশিয়ান হিসেবে দলের আদর্শ ও সিদ্ধান্ত প্রচারের চেষ্টা করি। আমি মূলত সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত সক্রিয়। আমেরিকা থেকে একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে, তার মতো অনেকেই আমার ইনফরমেটিভ লেখা ও বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করেন, যা তাদের ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করে।

 

এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনের আপনার অবস্থান কেমন ছিল?

 

ড. আসিফ মিজান: জুলাই আন্দোলনে আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলাম। ৫ আগস্টের পর আমি প্রথম শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছি, এর আগে প্রতিদিন অন্তত ২০-২২ ঘণ্টা কাজ করতাম। দেশে-বিদেশের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে দিন-রাত যোগাযোগ রক্ষা করেছি। এমনকি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও পরবর্তী সময়ে আমাকে জানিয়েছেন যে, তারা আমার ফেসবুক পোস্ট থেকে নিয়মিত তথ্য নিতেন এবং আন্দোলনের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতেন।

 

এশিয়া পোস্ট: প্রবাসে থেকে আন্দোলনে ভূমিকা রাখা এবং দেশে রাজপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি আন্দোলন করার মধ্যে স্পষ্ট ভিন্নতা আছে। আপনি এই পার্থক্যকে কীভাবে দেখেন?

 

ড. আসিফ মিজান: এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আসলে আকাশ-পাতাল। আমরা যারা বিদেশে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজ করেছি, আমরা অনেকটা সিনেমার হিরোর মতো ছিলাম—যিনি জানেন উঁচু থেকে লাফ দিলেও তার কিছু হবে না। আমরা নিরাপদ জায়গায় থেকে কথা বলেছি। তবে ৩-৪ আগস্ট আমি চরম আতঙ্কে ছিলাম। কারণ, আমার পরিবার ও দুই সন্তান ঢাকায় ছিল। পুলিশ কর্মকর্তারা ফোন করে আমার অবস্থান জানতে চাইতেন। রাজপথে আমার যে ভাই-বোনেরা জীবন বাজি রেখে নেমেছিলেন, তাদের ঝুঁকি ছিল সীমাহীন। আমি তাদের জানমাল ও ত্যাগের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। তাদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার ধৃষ্টতা আমার নেই।

 

এশিয়া পোস্ট: আন্দোলনের সময় আপনি ‘লাস্ট ট্রেন’ শব্দটি বারবার ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে আপনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?

 

ড. আসিফ মিজান: আমি লিখেছিলাম যারা এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে, তাদের জন্য এটিই শেষ সুযোগ বা ‘লাস্ট ট্রেন’। জাপানি প্রবাদ দিয়ে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম—হয় নিজেকে গুটিয়ে রাখো, নয়তো এই ট্রেনে চড়ে বসো। ট্রেনটি ছেড়ে গেলে আর কোনো সুযোগ পাবে না। আমি স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম যে, এই ফ্যাসিস্ট সরকার পড়ে যাবেই, আর বৈষম্যবিরোধী সংগ্রামে শামিল হওয়ার এটাই চূড়ান্ত সময়।

এশিয়া পোস্ট: প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ দেওয়ার ডাক নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। আপনার মতে এটি কি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল?

 

ড. আসিফ মিজান: সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্তটি সঠিক কি না, সেটি বড় কথা ছিল না। আমাদের লক্ষ্য ছিল রাজপথে থাকা ভাই-বোনদের যে কোনো মূল্যে সাপোর্ট দেওয়া। যখন মানুষ জীবন নিয়ে রাজপথে দাঁড়ায়, তখন সাময়িক অর্থনৈতিক কষ্ট বা পরিবারের সমস্যার কথা ভাবা আমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হয়েছে। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—স্বৈরাচারকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করতে হবে, এবং সেই লক্ষ্যে আমরা অনড় ছিলাম।

 

এশিয়া পোস্ট: শেখ হাসিনার সরকারকে আপনি ‘ফ্যাসিস্ট’ বা স্বৈরাচার বলে অভিহিত করেন। এর পেছনে আপনার যুক্তি কী?

 

ড. আসিফ মিজান: প্রথমত, এই সরকার কোনো বৈধ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা নিজের দলের লোককেও বিশ্বাস করতেন না, বরং প্রশাসন ও পুলিশের ওপর নির্ভর করে দিনের ভোট রাতে করেছেন। ফ্যাসিবাদ হওয়ার সব উপাদান তার মধ্যে ছিল। তিনি সংবিধান মানতেন না; বরং তিনি যা বলতেন, সেটিই ছিল আইন। তিনি একাধারে শাসক, বিচারক এবং রায় কার্যকরকারী ছিলেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে প্রধান বিচারপতিকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছেন। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করার যে চর্চা তিনি করেছেন, তাতে তাকে স্বৈরাচার বললেও আসলে কম বলা হয়।

 

এশিয়া পোস্ট: বিএনপির শাসনামলেও তো বিভিন্ন সমালোচনা ও ভুলত্রুটির অভিযোগ আছে। তাহলে কি শুধু শেখ হাসিনাকেই দোষারোপ করা যায়?

 

ড. আসিফ মিজান: বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এসেছে। আবার যখন জনগণ চায়নি, বিএনপি সম্মানের সঙ্গে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি বিরোধী দলের দাবি মেনে সংবিধান সংশোধন করে কেয়ারটেকার সিস্টেম চালু করেছিল এবং ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল। বিএনপি সবসময় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তারা যে ভুল করেনি তা নয়, তবে বিএনপি যখন ভুল করে, তখন তা স্বীকার করে নেয়। ভবিষ্যতেও জনগণ না চাইলে বিএনপি জোর করে ক্ষমতায় থাকবে না, এটাই বিএনপির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।

 

এশিয়া পোস্ট: বিএনপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ কী?

 

ড. আসিফ মিজান: বিএনপি দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। তবে সবকিছুর মতো এর ভেতরেও কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চায় কিছু কমতি হয়তো আছে। তবে বর্তমানে তারেক রহমান যেভাবে দল পরিচালনা করছেন এবং তৃণমূলে গণতন্ত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তাতে আমার বিশ্বাস যে বিএনপি শুধু দেশে নয়, দলের ভেতরেও একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলবে।

 

এশিয়া পোস্ট: আগামী দিনে রাজনীতিতে কি আবারও সক্রিয় হবেন?

 

ড. আসিফ মিজান: বর্তমানে আমি প্রবাসে সসম্মানে আছি। তবে ‘স্বদেশের প্রেম যত সেইমাত্র অবগত বিদেশেতে অধিবাস যার’—বিদেশে যতই স্বর্গসুখে থাকি না কেন, দেশের টান উপেক্ষা করা অসম্ভব। আমি দেশে ফিরতে চাই এবং দেশের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করতে চাই। সরাসরি রাজনীতিতে আসার আগে আমি মনে করি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমি সেই অবস্থানে আছি। যদি সুযোগ আসে এবং জনগণের চাহিদা থাকে, তবে আমি পরিপূর্ণভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করব।

 

এশিয়া পোস্ট: দেশে থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

 

ড. আসিফ মিজান: আমি এ বিষয়ে সরাসরি বিশেষজ্ঞ নই, তবে পুলিশ স্টাফ কলেজে ক্রিমিনোলজি পড়ার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গেস্ট লেকচারারদের কাছ থেকে জেনেছি যে, সরকার যদি সত্যি সদিচ্ছা দেখায় এবং আন্তর্জাতিক আইনের সাহায্য নেয়, তবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা অসম্ভব কিছু নয়। এর জন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করে কাজ করা প্রয়োজন।

 

এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনে আপনার ভূমিকা কি কেবল নিজের দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য ছিল?

 

ড. আসিফ মিজান: আমি ব্যক্তিগতভাবে কী পাব, সেই হিসাব কোনোদিন করিনি। আমি চেয়েছি আমার সময়টাকে দেশের প্রয়োজনে ফ্রুটফুলি ব্যবহার করতে। আন্দোলনে আমার কোনো ব্যক্তিগত রাগ ছিল না। এমনকি আওয়ামী লীগেও অনেক ভালো মানুষ আছেন। অনেক আওয়ামী পরিবারের সন্তানও এই ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলেন। শিশুদের হত্যা করা এবং দেশে অরাজকতা সৃষ্টির প্রতিবাদেই আমরা রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। লক্ষ্য ছিল একটাই—একজন ফ্যাসিস্টকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরানো।

 

এশিয়া পোস্ট: ভবিষ্যতে যেন নতুন কোনো স্বৈরাচার তৈরি না হয়, সে ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

 

ড. আসিফ মিজান: কেবল সংবিধান লিখে স্বৈরতন্ত্র রোখা সম্ভব নয়। মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনতে হবে। সত্য ও মিথ্যার এবং ন্যায় ও অন্যায়ের যে লড়াই, তা সবসময় অব্যাহত রাখতে হবে। তারেক রহমানের কাছে আমার নিবেদন থাকবে, তিনি যেন এমন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে গণতন্ত্রকামী মানুষের লড়াই থেমে না যায়। আমার নিজের দলও যদি কখনো স্বৈরাচারী আচরণ করে, তবে আমরাই রাজপথে প্রথম দাঁড়িয়ে যাব। দেশে যেন সবসময় সত্য ও ন্যায়ের জয়গান গীত হয়।

 

এশিয়া পোস্ট: সোমালিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে আপনি কী ধরনের সম্ভাবনা দেখতে পান?

 

ড. আসিফ মিজান: সোমালিয়া থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। সেখানে মোবাইল ব্যাংকিং অত্যন্ত উন্নত এবং মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে অনেক সাবলীল। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, সেখানে নির্বাচনের পর কোনো রাজনৈতিক ভায়োলেন্স হয় না। তারা গৃহযুদ্ধ কাটিয়ে যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ কোনোদিন সোমালিয়ার মতো গৃহযুদ্ধের পথে যাবে না, আর কেউ যদি দেশকে সেই পথে নিতে চায়, তবে জনগণ তাদের শেখ হাসিনার মতো করেই বিতাড়িত করবে।

 

এশিয়া পোস্ট: বিদেশের এই অভিজ্ঞতা এবং আপনার দীর্ঘ ক্যারিয়ার থেকে প্রাপ্ত সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?

 

ড. আসিফ মিজান: সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানুষের ভালোবাসা এবং বিশ্বাস। মানুষের ভালোবাসার ওপরে আর কিছু নেই। আমি যা-ই করি না কেন, মানুষের জন্য কিছু করতে পারা এবং তাদের ভালোবাসা পাওয়াটাই হলো প্রকৃত সাকসেস। বিশ্বাসহীন ভালোবাসা টেকে না, তাই মানুষের আস্থা অর্জন করাটাই বড় প্রাপ্তি।

 

এশিয়া পোস্ট: দর্শকদের উদ্দেশে আপনার শেষ বার্তা কী থাকবে?

 

ড. আসিফ মিজান: আসুন আমরা সবাই মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করি। নিজে কী পাব, সেই হিসাব না করে নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলি। আমাদের স্বপ্নের কোনো সীমা থাকা উচিত নয়। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। যোগ্য হওয়ার পাশাপাশি মহান আল্লাহর রহমত কামনা করতে হবে। শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না, স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে হবে।

 

এশিয়া পোস্ট: আপনাকে ধন্যবাদ।

 

ড. আসিফ মিজান: সবার জন্য অনেক শুভকামনা ও দোয়া। ধন্যবাদ এশিয়া পোস্টকে এবং আমার প্রিয় দর্শকদের।