Image description

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ইতিহাসের পাতা নয়— এটা এখনো চলমান এক রাজনৈতিক বাস্তবতা।’ বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের ভাষায়, এই এক বাক্যই আসন্ন জুলাই মাসের পুরো রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করে। বছর ঘুরে আবারও সামনে এসেছে জুলাইয়ের বর্ষপূর্তি, আর সেই উপলক্ষকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন করে উত্তাপ, প্রস্তুতি আর শক্তি প্রদর্শনের হিসাব-নিকাশ।

‘জুলাইয়ের দাবি এখনো অপূর্ণ’ রয়ে গেছে বলে দাবি করছেন বিরোধী জোটের নেতারা। তাই এই জুলাইকে তারা শুধু স্মরণ নয়— বরং আবারও ‘রাজপথে ফেরার সময়’ হিসেবে দেখছে। তাদের অভিযোগ, যে আন্দোলন রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি আর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার অনেক কিছুই এখনো বাস্তবায়নের বাইরে রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে জুলাই মাস জুড়ে দেশব্যাপী ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

 

 

এ কারণে জুলাই জুড়ে দেশব্যাপী পথসভা, গণসংলাপ, তরুণদের সমাবেশ এবং অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট স্মারক কর্মসূচির আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। জোটের নজর থাকবে জুলাই জাতীয় সনদ, বিচার ও সংস্কার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অভ্যুত্থানের চেতনা ও দাবিগুলোকে জনআন্দোলনের কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে ধরে রাখার দিকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। তবে চলতি মাসে জোটভুক্ত দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে কর্মসূচির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জোটগত কর্মসূচির পাশাপাশি শরিক দলগুলো নিজ নিজ উদ্যোগেও আলাদা কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জুলাইয়ের ইস্যু ছাড়াও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সক্রিয়তা এবং সীমান্ত এলাকায় পুশইন ইস্যুকেও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে বিরোধী দলগুলো।

জোটসংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে সংঘটিত গণহত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়টিও তাদের কর্মসূচির অন্যতম প্রধান দাবি হবে।
১১ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাই মাস জুড়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন শেষে ৫ আগস্ট একটি বড় রাজনৈতিক সমাবেশ আয়োজনের বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা চলছে। গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগ কিংবা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে গণভোট বাস্তবায়নে সরকারকে ‘বিশেষ চাপ’ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দাবি আদায়ে সমাবেশ থেকে সরকারকে সময় বেঁধে দেওয়া হতে পারে বলেও জানা গেছে।

 

 

জুলাই মাস জুড়ে দলীয় ও জোটগত কর্মসূচিতে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায় জোটের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণভোট বাস্তবায়নের দাবিতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ, আলোচনা সভা, গণসংযোগ এবং শহীদ পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় কর্মসূচিরও পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১১ দলীয় ঐক্য জোটের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমন্বয়কের ভূমিকায় থাকারও প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট বাস্তবায়ন এবং গণহত্যার বিচার— এই তিনটি ইস্যুতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে আমরা জনগণের সামনে যাব।’

জোটের নেতাদের ভাষায়, ‘বিচার দৃশ্যমান না হলে জনগণের হতাশা বাড়বে।’ তাই জুলাই-আগস্টের ঘটনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারকে তারা এবার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ ‘মাস্টারমাইন্ডদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার’ করার দাবিও জোরালোভাবে তোলা হবে বলে তারা জানান।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আগামীর সময়কে বললেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন, গণহত্যার বিচার এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জুলাই মাস জুড়ে দলীয় ও জোটগত কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা জনগণের সেই প্রত্যাশার পক্ষে সোচ্চার থাকব।’

 

 

অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপির অবস্থানও স্পষ্ট। দলটির নেতারা মনে করছেন, গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রশ্নে জনগণকে আবার সংগঠিত করার এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু দুই বছর পরও বিচার, সংস্কার ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত।’

একই সুর শোনা যাচ্ছে দলটির আরেক নেতা সারজিস আলমের কথায়। এনসিপির এই মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘জুলাইকে কেন্দ্র করে আমরা মাসব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিচ্ছি। ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমরা দলীয় ও জোটগতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করব। আওয়ামী লীগের অপরাধীর বিচারের আওতায় না এনে তাদের কর্মসূচি পালনের সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিবাদেও আমাদের কর্মসূচি থাকবে। ৩ আগস্ট অথবা ৫ আগস্ট বড় কোনো সমাবেশ আয়োজনেরও চিন্তা আছে।’