‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য অসহায় ও মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন ট্রাম্প।’ গত বুধবার চুক্তি সইয়ে পরের দিনের বিবৃতিতে এ কথাই বলেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই তার নজির দেখল বিশ্ব। শর্ত মানতে পরের দিনই (বৃহস্পতিবার) ইসরায়েলকে কড়া ধমক দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এরপরই হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে রাজি হয়েছে ইসরায়েল।
গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা) থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা। ফ্রান্সের বিখ্যাত ভার্সাই প্যালেসের ওই ‘ডিজিটাল স্বাক্ষর’র পর থেকেই চুক্তি বানচালে লেবাননে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গত বৃহস্পতিবার থেকে এক দিনেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ১৫০টি টার্গেটে হামলা চালায় তারা। ১২ দফায় চালায় বিমান হামলা। এতে বেঁকে বসেছিল ইরানও। দুপক্ষের টানাপড়েনে পিছিয়ে গিয়েছিল সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকের চুক্তি-পরবর্তী আলোচনাও। খবর রয়টার্স ও এএফপির।
লেবাননে ইসরায়েলের গোঁয়ার্তুমি দেখে কঠোর সতর্কবার্তা দেন ভ্যান্স। হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের প্রধান ও শক্তিশালী মিত্র। তাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো তাদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমি যদি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তাহলে অন্তত আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে আক্রমণ করতাম না।’ হোয়াইট হাউজে এদিনের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে তিনি আরও বলেছেন, ‘৯ বা ১০ মিলিয়নের (জনসংখ্যা) একটি দেশ শুধু হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তাদের সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করতে পারে না।’
ইরান চুক্তির বিরোধিতা করা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নাম উল্লেখ করে বলেছেন, ‘তাদের বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া উচিত।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বহুল প্রতীক্ষিত ‘চুক্তি স্বাক্ষর’ অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ার পরপরই বড় ধরনের এ কূটনৈতিক সাফল্য এলো লেবাননে। তবে ইরান-মার্কিন আলোচনাটি এখনো সেই অনিশ্চিত অন্ধকারেই। বাতিল হওয়া দ্বিতীয় ধাপের বৈঠকটি কবে নাগাদ আবার শুরু হবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে লেবাননে ব্যাপক বিমান ও রকেট হামলা চালায় ইসরায়েল। এসব হামলায় ১৮ জন নিহত হন এবং হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের হাতে চার ইসরায়েলি সেনা প্রাণ হারান।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে জানান, আজ (শুক্রবার) দিনের শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি ও হামলার পর ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ এখন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের সরাসরি সহায়তায় চুক্তিটি সম্পন্ন করতে পেরেছেন। লেবানন ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তির অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। হিজবুল্লাহর একজন সিনিয়র আইনপ্রণেতা জানিয়েছেন, তেহরানের পক্ষ থেকে হিজবুল্লাহকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, লেবাননে একটি সামগ্রিক ও কার্যকর যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের শান্তি আলোচনা কোনোভাবেই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সরাসরি এই শান্তি আলোচনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি লেবাননে ইসরায়েলি বর্বরোচিত হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও মিত্রদের রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে তেহরান।
ইরান যুদ্ধ অবসানের অন্তর্বর্তী চুক্তিকে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দেওয়ার জন্য গতকাল সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসার কথা ছিল দুদেশের। কিন্তু হঠাৎ করেই লেবাননে তীব্র লড়াই শুরু হয় ইসরায়েল-হিজবুল্লাহর, যা বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার আলোচনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় শেষ মুহূর্তের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি বাতিল করতে বাধ্য হয় দুই পক্ষ।