নির্বাচিত সরকার গঠনের চার মাসেও যেন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পিছু ছাড়ছে না। স্বস্তি ফিরছে না জনমনে। দিন যতই গড়াচ্ছে অপরাধীরা ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সসময়ের ‘মব সন্ত্রাস’ এখন ভিন্ন আঙ্গিকে দেখা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামপর্যায় পর্যন্ত খুনসহ গুরুতর অপরাধের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন। অপরাধীদের লাগাম এখনই টেনে না ধরলে ওই সব নির্বাচনের সময় অবৈধ অস্ত্রধারীরা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। কারণ নির্বাচনে প্রভাবশালী প্রার্থীরাও নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করতে অপরাধীদের ব্যবহার কতে পারেন।
আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক ব্যবসা ও জমিজমা-সংক্রান্ত দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। কোথাও আপনজনের হাতেই খুন হচ্ছেন স্বজন, আবার কোথাও গোষ্ঠীগত সঙ্ঘাতে ঝরছে প্রাণ। এমনকি পুলিশের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটছে। মাদকের বিস্তার এখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। শহরের কিশোর গ্যাং কালচার সাধারণ মানুষের আতঙ্ক। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধীরগতির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ ও চুরির মতো অপরাধের পরিসংখ্যান একটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সেই হিসেবে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। জুলাই-আগস্ট-২০২৪ আন্দোলনের সময় বিপুল অস্ত্র ও গুলি লুট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যার একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এই চার মাসে এক হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ডের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পাঁচ ধরনের গুরুতর অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ২২১টি। অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অপরাধের মামলা দায়ের হচ্ছে দেশের বিভিন্ন থানায়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। গত ৮ জুন রাতে মৌচাক এলাকায় হত্যা করা হয় ১৯ নং ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের রমনা থানার সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন তালুকদারকে। গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দেশের তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম খন্দকার নাঈম ইসলাম টিটনকে। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর নিজ বাসার সামনে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন ঢাকার আরেক সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ। মোটরসাইকেল আরোহী দুই সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশকে খুব কাছ থেকে গুলি করে। মাথায় গুলিবিদ্ধ পলাশ এখন মৃত্যুর মুখোমুখি। গত ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে তিন শিশুসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খুলনার লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামকে (৩৫) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন। ঘটনার সময় একটি মোটরসাইকেলে এসে হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। খুলনা মহানগরে বর্তমানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার দমনে বিশেষ যৌথ অভিযান চলমান। এর মধ্যেই প্রকাশ্যে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে খুলনা নগরে ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরসংলগ্ন জনতা ব্যাংকের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি করে মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী লোকমান হোসেনকে। এ সময় ১৪ হাজার ডলার ভর্তি ব্যাগ লুট করে নেয়া হয়। গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানের একটি বাজারের প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। খুনের শিকার মাসুদুল রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ স্বপনের ছোট ভাই। বেলা আড়াইটায় এবং বাজারের মধ্যে রিকশায় আসা সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করার পরেও আতঙ্কে কেউ তাকে উদ্ধারে এগিয়ে যায়নি। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেখানে পড়ে ছিল ওই নেতার লাশ। গত শনিবার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ঘরে ঢুকে মা ও মেয়েকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। দেশে বিপুল অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ধীরগতির কারণে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে। টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক ইনকিলাবকে বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়ন এবং অপরাধ দমনে কার্যকর কৌশল দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ছিল, যা যথাযথভাবে হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। সার্বিকভাবে, খুনসহ গুরুতর অপরাধের ঊর্ধ্বগতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, এসব অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের ধরতে থানা-পুলিশকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তঃকোন্দল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ হামলার ঘটনা ঘটে।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র বলছে, দেশে অপরাধ বাড়ার মূলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতাও রয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পর্দার আড়ালে থেকে সহযোগীদের পরিচালনা করছে। তাদের হাতে কয়েক হাজার অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী জামিন পাওয়া এই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে দেশে ফিরেছে। অনেকেই চেষ্টা চালাচ্ছে দেশে ফেরার। এদের বাইরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে গ্রেফতার না হওয়া জিসান আহমেদ ওরফে জিসান দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মতিঝিল ও রামপুরাসহ আরো কয়েকটি এলাকায় ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি শুরু করেছে। তালিকাভুক্ত এসব সন্ত্রাসী এখন দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অপরাধ জগৎ ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ নিয়ন্ত্রণ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রোববার ইনকিলাবকে বলেন, দেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। এসব অস্ত্রে খুনাখুনির কারণে সমাজে আতঙ্ক ছড়াছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে।