Image description

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশ কেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি? এখনো কেন দেশের কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে? কেন মানুষ দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খায়? এ দেশের শিশুরা কেন বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়? কেন নারীদের সম্ভ্রমহানির ঘটনা ঘটে চারপাশে? এর কারণ হিসেবে অনেকেই অনেক কথা বলবেন। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, আমাদের এই পিছিয়ে পড়ার কারণ একটাই- তা হলো আমাদের মধ্যে বিভেদ। বিভেদ থেকে হানাহানি। এই বিভাজন বাংলাদেশের সব সম্ভাবনার গলা টিপে ধরেছে। অফুরন্ত সম্ভাবনা, এ দেশের মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি আর প্রকৃতির অপার সুযোগ থাকার পরও বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে? তার প্রধান কারণ হলো বিভক্তি আর হানাহানি।

অথচ বাংলাদেশ এক অপূর্ব ঐক্যের মেলবন্ধনে গড়া এক দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় বিশ্বাস এক। এ দেশে জাতিগত দাঙ্গা নেই। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে হানাহানি কম, সংস্কৃতি নিয়েও নেই তেমন ভেদাভেদ। তবু এ দেশের কিছু মানুষ যেন ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। একে অন্যকে নিঃশেষ করতে উদ্যত। ভিন্নমতকে খতম করতে হবে- এরকম একটি মানসিকতা আমাদের সব সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফসল। গোটা জাতির ইস্পাতকঠিন ঐক্যই আমাদের বিজয়ী করেছিল। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা সেই ঐক্যের ধারা ধরে রাখতে পারিনি। ক্ষুদ্র স্বার্থে, দলীয় স্বার্থে দেশকে বিভক্ত করেছি। আমার লোক, তার লোক, বাছতে গিয়ে গোটা জাতি আজ বিভক্ত। রাজনৈতিক এই বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের সর্বত্র। 

সরকারি কর্মচারী থেকে সাংবাদিক; বুদ্ধিজীবী থেকে চিকিৎসক; প্রকৌশলী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক- সর্বত্র বিভাজনের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রবণতা আমাদের স্বপ্নগুলোকে গ্রাস করেছে। বিরোধীপক্ষ মানেই আমার শক্র। তাকে শেষ করে দিতে হবে- এই মানসিকতা বাড়তে বাড়তে এখন মহামারির আকার ধারণ করেছে। যখন যে ক্ষমতায় গেছে সেই ভেবেছে বিরোধী মতকে নির্মূল করতে হবে, না হলে ক্ষমতার চেয়ার নিরাপদ নয়। শুরু হয়েছে ভিন্নমত দমনের নামে প্রতিহিংসার রাজনীতির এক নীতিহীন প্রকাশ। এভাবেই গোটা দেশকে সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি বিভক্তির চোরাগলিতে বন্দি করেছে। অথচ আমাদের দেশে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর ন্যায্যতার জন্য ৩০ লাখ শহীদ বুকের রক্ত দিয়েছিলেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল এ দেশের মানুষ।

আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। ভিন্নমতের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যই এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমাদের যেমন ভিন্নমত থাকবে, তেমনি দেশের প্রশ্নে এ দেশের সবাইকে থাকতে হবে ঐক্যবদ্ধ। এটাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা। দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমরা এক এবং অভিন্ন থাকব-এটাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন। কিন্তু আমরা পথ হারিয়েছি। এখন সময় এসেছে, সঠিক পথে ফিরে আসার।

আমরা যদি পৃথিবীর উন্নয়নের রোল মডেল রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব, দেশের মৌলিক প্রশ্নে যে জাতি যত ঐক্যবদ্ধ তারা তত বেশি উন্নতি করেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম তার বড় উদাহরণ। গণতন্ত্রে অনুকরণীয় রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের রাজনৈতিক দলের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য থাকলেও দেশের প্রশ্নে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এক। সরকার পরিবর্তনের পর গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন খুব একটা দেখা যায় না। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু আমরা স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও এই ধারা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।

এখনো কে দেশের পক্ষে, কে বিপক্ষে সেটাই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। কোন দল কোন দেশের দালাল সেটা নিয়ে বিতর্কেই আমাদের উন্নয়ন ভাবনা অগ্রাধিকার হারায়। ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলের মতামতের তোয়াক্কা করে না, আবার বিরোধীদল ক্ষমতাসীনদের ভালো কাজের প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত হয়। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে নিজেদের লোক খোঁজে। পেশাজীবীদের মধ্যে নিজেদের লোক খুঁজতে গিয়ে বেছে নেয় চাটুকার আর সুবিধাবাদীদের। তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সরকারের সঠিক মূল্যায়ন করে না। সবকিছুর প্রশংসা করে সরকারকে নিয়ে যায় বাস্তবতা থেকে দূরে। চারপাশে পরিবেষ্টিত থাকা এসব সুযোগসন্ধানীই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে। ক্ষমতাসীনরা এদের কারণে অন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে কী হচ্ছে তা উপলব্ধি করতে পারে না। স্তাবক আর চাটুকারদের কারণে সরকারের সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা কমে যায়। 

এভাবেই একটি দল এবং একটি সরকার ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি দল যখন ক্ষমতায় আসে তখন তারা কোনো দলের থাকে না। তারা হয় সব জনগণের সরকার। যারা তাদের ভোট দেয়নি, তাদেরও সরকার। তাদের ভালোমন্দ দেখা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একজন চিকিৎসক ভিন্নমত লালন করে, এজন্য তার পেশাগত অধিকার হরণ করা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের মানসিকতা হতে পারে না। গণতন্ত্রে ভিন্নমতের সাংবাদিক থাকবেন, আইনজীবী থাকবেন, শিক্ষক বুদ্ধিজীবী থাকবেন, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু বিভাজনের রাজনীতি এই সৌন্দর্য নষ্ট করে। এক মতের লালন ও তোষণই বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসার রাজনীতির আঁতুড়ঘর। বিরোধীদল মনে করে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে হবে, গিয়ে প্রতিশোধ নিতে হবে। প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধ সারা দেশে সৃষ্টি করে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি।

এই প্রতিহিংসার রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম শিকার হন ব্যবসায়ী এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তারা চায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা তাদের প্রতি অনুগত হোক। সরকারের অনুগত না হলে ব্যবসা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে ব্যবসা বাঁচাতে, শিল্প বাঁচাতে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে বাধ্য হন। বিভক্ত রাজনীতির দেশে ক্ষমতার পালাবদলের এই ব্যবসায়ীদের দোসর বানিয়ে ফেলা হয়। তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। একে ওই উদ্যোক্তার যতটা না ক্ষতি হয় তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় দেশের অর্থনীতির। কারণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। এভাবেই বিভাজনের রাজনীতি পিছিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশকে।

এখন এ অবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার প্রথম ১০০ দিনে একটি বার্তা দিয়েছে যে, তারা প্রতিহিংসার রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। সংসদে বিরোধী দলের মতামত গ্রহণ, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যোগাযোগের বিলুপ্তপ্রায় রীতিগুলো পুনরায় চালু করার একটা চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বারবার সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। এ কথাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। আসন্ন বাজেট সরকারের সামনে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী খোলামেলাভাবেই বলেছেন, দেশের অর্থনীতি এখন সংকটে। আসন্ন বাজেট থেকে সেই সংকট উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। প্রতিহিংসা আর বিভক্তির রাজনীতির অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে এলেই পাওয়া যাবে সামনে এগিয়ে চলার পথ। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আসন্ন বাজেটে কোন খাতে কত বরাদ্দ রাখা হবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাংলাদেশের এগিয়ে চলার দিকনির্দেশনা কেমন হবে তা নির্ধারণ। ইউনূস সরকার গত দেড় বছর বাংলাদেশকে চূড়ান্তভাবে বিভক্ত এবং বিপর্যস্ত করেছে। এই বিভক্তি রেখে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। দেশের ২০ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা কে কার লোক, অতীতে কে কী করেছে সেই হিসাব না করে তাদের আস্থায় নিতে হবে।

ইতোমধ্যে বন্ধ কলকারখানা খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ হতে হবে পক্ষপাতহীন এবং দেশের মানুষের স্বার্থে। বেকারত্ব কমাতে বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে হবে। সেজন্য ইউনূস সরকারের আমলে করা মিথ্যা মামলা, নানা রকম হয়রানির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হবে বেসরকারি খাতকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়, বিগত ইউনূস সরকারের সময় এটা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তাই নতুন অর্থবছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। সর্বত্র আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একজন নাগরিকও যেন মনে না করেন, তিনি অধিকারহীন। দেশের সব নাগরিক যেন ভয়হীন পরিবেশে বসবাস করতে পারে তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

সবাই যদি মনে করে দেশটা আমার তাহলে এ দেশের অগ্রযাত্রা কেউ আটকাতে পারবে না। সরকারের প্রথম ১০০ দিন ছিল তার পরিকল্পনা জনগণের কাছে পৌঁছানোর। সেই পরিকল্পনায় সবার আগে বাংলাদেশের বিষয়টি সামনে এসেছে। আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ঘোষিত হয়েছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে। এ বাজেটের মাধ্যমে শুরু হোক তার বাস্তবায়ন। বাজেট কেবল খাতওয়ারি বরাদ্দের হিসাব নয়, সুশাসন ও জবাবদিহির একটি রূপরেখা। এবারের বাজেট তাই সরকারের প্রথম পরীক্ষা।