ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’র নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবিতে গতকাল দিনভর বিক্ষোভ হয়েছে ব্যাংকটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে।
বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধলে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। গতকাল সকালে মতিঝিলের দিলকুশায় ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ এর ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ অফিস এলাকা ও অনুমতি না থাকায় কর্মসূচি শুরুর পরই পুলিশ তাদের সড়ক ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করে। অনুরোধে অবস্থান না ছাড়লে পরে লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
এর আগে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে সকাল থেকেই দিলকুশা এলাকায় জড়ো হতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভে স্থানীয় জামায়াতের অনেক কর্মী-সমর্থকদেরও দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। সকাল ৯টার দিকে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে অবস্থান নেন কয়েকশ’ মানুষ। এ সময় তারা বলেন, খুরশীদ আলম বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর থাকাকালীন বিতর্কিত এস আলম গ্রুপকে ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেয়ার ক্ষেত্রে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিলেন।
গত বছরের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে খুরশীদ আলমসহ তৎকালীন চার ডেপুটি গভর্নর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এমন একজন বিতর্কিত ও ক্ষমতাচ্যুত ব্যক্তিকে দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া রহস্যজনক এবং এর পেছনে পুনরায় ব্যাংকটি লুটের গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। এই জন্য আমরা এই খুরশীদ আলমের পদত্যাগ চাই।
এ সময় তারা ৪ দফা দাবি উত্থাপন করেন। বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলো হলো- এস আলম গ্রুপের অন্যতম সুবিধাভোগী ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে অবিলম্বে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করতে হবে, ব্যাংকের পেশাদারিত্ব ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) মুহাম্মদ ওমর ফারুক খানকে দ্রুত স্বপদে ফিরিয়ে আনতে হবে, দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য একজন যোগ্য ও নিরপেক্ষ নতুন গভর্নর নিয়োগ দিতে হবে, অথবা বর্তমান গভর্নরের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে, ব্যাংকের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে পূর্বে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে চাকরিচ্যুত বা বিতর্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ যেকোনো শাখার সামনে আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
সকালে যখন গ্রাহক ও শেয়ার হোল্ডাররা এই দাবিগুলো উপস্থাপন করছিল ঠিক তখনই সেখানে জলকামান, সাঁজোয়া যান নিয়ে উপস্থিত হন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদস্যরা। প্রথমে বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে রাস্তা ছেড়ে দেয়ার জন্য তাদের অনুরোধ করেন ডিএমপি’র মতিঝিল বিভাগের পুলিশ কর্মকর্তারা। কিন্তু তারা রাস্তা ছাড়তে রাজি হননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, মানববন্ধন শুরুর পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ জলকামান থেকে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে রঙিন পানি ছোড়া শুরু করে।
একইসঙ্গে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে লাঠিচার্জ করতে করতে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে। বেশ কিছুক্ষণ এমন উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। তবে পুলিশের অ্যাকশনের পর আবারো জড়ো হতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। দুপুর ১২টার দিকে আবারো বিক্ষোভকারীরা সংগঠিত হয়ে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নেন। ওই সময় আন্দোলনকারীরা চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল, সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল এবং ব্যাংকটিকে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। তারা বলেন- আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা কেউ এখান থেকে যাবো না। এদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
দিনভর উভয়পক্ষই মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। আর এনিয়ে পুরো ব্যাংক পাড়ায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করে সারাদিন। পুরো এলাকায় ছিল থমথমে পরিস্থিতি। পরে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ এর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক নুরুন নবী মানিক বলেন, গত ২৪শে মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান এবং এমডি ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে আবারো এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
আমরা এই নিয়োগ মেনে নেবো না। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ইসলামী ব্যাংকে পুনরায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। এর প্রতিবাদে গত ২৪শে মে দেশের বিভিন্ন শাখার সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি আমলে নেয়নি। তাদের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে তারল্য সংকটে রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে আমরা যে ৫ দফা দাবির স্মারকলিপি দিয়েছি, সেগুলো নিয়ে গভর্নর আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি।
তিনি বলেন, আজকে আমরা পুলিশকে অবহিত করেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছিলাম, আমরা তাদেরকে বলেছিলাম চেয়ারম্যান ব্যতীত ইসলামী ব্যাংকের অন্যান্য কর্মকর্তারা ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কিন্তু পুলিশ হঠাৎ আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা চালিয়েছে, আমাদের শতাধিক সহযোগী আহত হয়েছে। আহতদের সবাইকে তাৎক্ষণিকভাবে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এর মধ্যে গুরুতর আহত কয়েকজনকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল কাকরাইল শাখায় ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও পাঁচজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে কয়েকশ’ মানুষ অবস্থান নিয়ে কার্যত অবরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। মতিঝিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় এতে আশপাশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল এবং এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। পুলিশ বারবার তাদের বুঝিয়ে সড়ক ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তারা সরে না গিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আন্দোলনকারীদের কয়েক দফা সতর্ক করা হয়। এরপরও তারা সড়ক না ছাড়ায় আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সংঘর্ষে মতিঝিল বিভাগের এসি (সহকারী পুলিশ কমিশনার) পেট্রোলসহ অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।