Image description

বিদেশি ঋণের দায় মেটানোর চাপ, রাজস্ব ঘাটতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা- এই তিন চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কারণে এবারের বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। এ কারণে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ঋণের চাপ সামাল দেয়া এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য নিয়ে নতুন বাজেট সাজানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ই জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। চলতি অর্থবছর বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে ১ বছরের ব্যবধানে বাজেট বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে কর ও ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের সংস্কার এবং করজাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে দেশের ৪৬৫টি ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য সংগঠনের কাছে সদস্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়েছে এনবিআর। এসব সংগঠনের আওতায় থাকা লক্ষাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, সদস্যদের তালিকা চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে এনবিআর। মেম্বারশিপের তালিকা দিয়েছি। সংগঠন থেকে তালিকা নিয়ে করের আওতায় আনার প্রক্রিয়া সঠিক হবে না দাবি করে তিনি বলেন, সবাই সংগঠনের সদস্য হয় না। আমাদের দোকান মালিক সমিতির সদস্য প্রায় ৭০০, কিন্তু সারা দেশে দোকানের সংখ্যা তো কোটির ওপরে হবে। যারা দোকান করেন তাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, ট্যাক্স ও ভ্যাট দেন। সেখানে আবার নতুন করে সংগঠনের তালিকা ধরে করের আওতায় আনার যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, আমরা কর নেয়ার বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু সেখানে কাঠামোগত ব্যবস্থা থাকবে। তার আলোকে ও এনবিআর তার কর্ম পরিধির ভেতরে থেকে কর আদায় করবে। কর আদায়ে যেন ব্যবসায়ীরা হয়রানির স্বীকার না হন, সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের জন্য নিবন্ধিত থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় মাত্র সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েও কার্যত নিষ্ক্রিয়। এই বাস্তবতায় আগামী এক বছরের মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর।

জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভ্যাট থেকেই ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের চাপ মোকাবিলায় করজাল সম্প্রসারণ একমাত্র উপায় দেখছে সরকার।
শুধু ভ্যাট নয়, বিলাসবহুল গাড়ির ওপর করহারও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বর্তমানে সাড়ে তিন হাজার সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির জন্য অগ্রিম আয়কর দুই লাখ টাকা হলেও আগামী বাজেটে তা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করা হতে পারে। একাধিক গাড়ি থাকলে করের পরিমাণ আরও বাড়বে। একইসঙ্গে পরিবেশ সারচার্জের পরিবর্তে নতুন করে সম্পদ কর আরোপের চিন্তাও করছে সরকার।

কর আদায়ে নতুন আরেকটি বড় পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে ব্যাংক লেনদেনের ওপর নজরদারি। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বড় বড় কোম্পানির ডিলার, সাব-ডিলার ও পরিবেশকদের ব্যাংক লেনদেন বিশ্লেষণ করে কর আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কারণ এসব ব্যবসায়ীর বড় একটি অংশের ই-টিআইএন নেই এবং তারা আয়কর রিটার্নও দাখিল করেন না।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এনবিআরের সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে করদাতাদের ব্যাংক লেনদেন, আয়-ব্যয় ও সমাপনী স্থিতির তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর রিটার্নে যুক্ত হবে। এতে ভুয়া অডিট রিপোর্ট ও লেনদেন গোপনের প্রবণতা কমবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, আগামী জাতীয় বাজেটে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে করব্যবস্থা আরও সহজ করা এবং অযৌক্তিক করের চাপ কমানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। সরকার যৌক্তিক করনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যদি রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারি তাহলে তো ঋণনির্ভরশীলতা থেকে বের হওয়া যাবে না। আদায় বাড়াতে না পারলে ব্যয় কমাতে হবে। বিলাসবহুল ব্যয় বা অপচয়মূলক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনাটাই হচ্ছে আগামী বাজেটের চ্যালেঞ্জ।