Image description

নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার চিরায়ত আনন্দের পথে এবারও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গণপরিবহনের তীব্র সংকট আর পকেটকাটা অতিরিক্ত ভাড়া। ফলে পকেটের টান আর বাড়ি ফেরার আকুলতায় বাধ্য হয়েই মালবাহী ট্রাক কিংবা পিকআপের খোলা ডালায় ওঠার মৃত্যুঝুঁকি নিচ্ছেন স্বল্প আয়ের মানুষ।

তীব্র রোদ আর মুষলধারে বৃষ্টির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে এমন রুদ্ধশ্বাস ভ্রমণ যেমন বিপজ্জনক, তেমনই চরম যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু নির্মম অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে এই মরণফাঁদকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিতে হচ্ছে ভাগ্যবিড়ম্বিত এই মানুষদের।

এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার খেসারত দিতে হলো উত্তরবঙ্গের ১৫টি পরিবারকে। সোমবার ভোরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে লোহার রড বোঝাই একটি ট্রাক উল্টে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের স্বপ্ন ছিল তাদের সবার। কিন্তু তাদের আর ঘরে ফেরা হয়নি

হাইওয়েতে এ ধরনের যাতায়াতের ওপর প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা এখন শুধু কাগুজে নিয়মে পরিণত হয়েছে।

যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মোঃ খাদিজুজ্জামান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, “নিম্নআয়ের মানুষ মূলত পরিবহন ভাড়ার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ঈদের ভিড়ে স্বাভাবিক দামের চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ বেশি দাম দিয়ে টিকিট কেনা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”

ঢাকার একজন পোশাক শ্রমিক রাহেলা আক্তার, যার বাড়ি ঝিনাইদহে। আকাশচুম্বী ভাড়ার কারণে বিপাকে পড়া যাত্রীদের একজন তিনি। তিনি বলেন, “আমরা সবসময় বাস পাই না, আর ব্ল্যাক মার্কেটের টিকিটের দাম দেওয়ার সামর্থ্য তো আমাদের একেবারেই নেই। তাই গত তিন বছর ধরে আমরা ট্রাকে করেই বাড়ি যাচ্ছি।”

যাত্রীরা জানান, এই বিপজ্জনক প্রবণতা শুধু ঈদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাক এবং মিনি-ট্রাকগুলো নিয়মিতভাবে মালামাল খালাস করে ফেরার পথে যাত্রী তুলে নেয়। নিম্নআয়ের যাত্রীরা কেবল কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য স্বেচ্ছায় এই ঝুঁকি মাথা পেতে নেন। ঢাকার প্রধান প্রধান শ্রমিক এলাকা যেমন কাপ্তানবাজার, চকবাজার, গাবতলী ও কারওয়ানবাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন এবং মহাসড়কের চেকপোস্টে প্রতি বছরই এই দৃশ্য দেখা যায়।

হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান টাইমসকে বলেন, “নিম্নআয়ের শ্রমিকরা টাকা বাঁচাতে ট্রাকে উঠে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেন। যেখানে বাসের টিকিট দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা, সেখানে তারা মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় ট্রাক চালকদের সাথে চুক্তি করে যাতায়াত করতে পারেন।”

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন এটি ঠেকাতে ব্যর্থ হলো জানতে চাইলে তিনি টাঙ্গাইলের দুর্ঘটনার ধরনটি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “শ্রমিকরা লোহার রড বোঝাই ট্রাকের ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে ভেতরে যাত্রী লুকিয়ে আছে।”

তিনি আরও বলেন, ঈদের তীব্র ভিড়ের মধ্যে গভীর রাতে প্রতিটি ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি করতে গেলে মহাসড়কে বিশাল যানজটের সৃষ্টি হতো।

তবে ডিআইজি হাবিব স্বীকার করেন, ১৫টি প্রাণের অবসান আরও কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি রাখে। তিনি পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন বন্ধ করতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।

হাবিবুর রহমান খান জানান, বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশ তাদের পূর্ণ শক্তি দিয়ে কাজ করছে। তাদের নিজস্ব আড়াই হাজার সদস্যের পাশাপাশি এপিবিএন এবং জেলা পুলিশের আরও এক হাজার অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশত, এটিই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ট্রাক দুর্ঘটনা নয়। ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট দেখে বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রদের বহনকারী একটি পিকআপ ভ্যান উল্টে ডোবায় পড়ে যায়। সেই ঘটনায় পানিতে ডুবে মারা যায় ৪৩ জন শিশুসহ ৪৫ জন। তরুণ ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৩৪ জন ছিল আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বাকিরা ছিল ১১টি গ্রামের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্র। কেউ কেউ ঘটনাস্থলেই মারা যায়, আবার কেউ কেউ কয়েকদিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলোর স্মরণে দুর্ঘটনাস্থলে এবং আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এখন ‘অন্তিম’ ও ‘আবেগ’ নামে দুটি স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে।

সমাধান কোথায়?

পরিবহন বিশেষজ্ঞ মোঃ খাদিজুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ঈদে গণপরিবহন সংকট একটি অনিবার্য গাণিতিক বাস্তবতা। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমাদের বাস, ট্রেন এবং লঞ্চের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ঢাকা থেকে একযোগে মানুষের চলে যাওয়ার তুলনায় অনেক কম। যদি প্রায় ৮০ লাখ মানুষ রাজধানী ছাড়তে চায়, আর আমাদের মোট পরিবহন সক্ষমতা হয় মাত্র ৩০ লাখ, তবে বিশাল সংখ্যক যাত্রী ট্রেনের ছাদ বা পণ্যবাহী ট্রাকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য হবে। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়।”

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান উল্লেখ করেন, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা পদ্ধতিগত ত্রুটি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। তিনি বলেন, “সরকারের নিজস্ব গণপরিবহন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে বেসরকারি পরিবহন অপারেটরদের ওপর আমাদের নির্ভরতা অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া বৃদ্ধি এবং সার্বিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।”

দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে সাইদুর রহমান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনকে (বিআরটিসি) শক্তিশালী করা, রেল নেটওয়ার্ক সংস্কার করা, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো এবং মহাসড়কের ওপর চাপ কমাতে নৌ পরিবহনকে আধুনিকীকরণের পরামর্শ দেন।

তবে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সময়ের প্রয়োজন। ঈদের ছুটির ভিড় সামলানোর তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা অব্যবহৃত সরকারি সম্পদ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। বড় ছুটির দিনগুলোতে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার এবং বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়ের শত শত বাস সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এই সরকারি যানবাহনগুলোর অন্তত ৬০ শতাংশও যদি সাধারণ যাত্রী পরিবহনে নিয়োজিত করা যায়, তবে নিম্নআয়ের মানুষ ন্যূনতম নিরাপত্তা ও স্বস্তির সাথে যাতায়াত করতে পারবে।

টাঙ্গাইল দুর্ঘটনা যেভাবে ঘটেছিল:

ঈদের ভারী ভিড়ে যানজট কমাতে কর্তৃপক্ষ পশুবাহী যান ছাড়া ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং লরি মহাসড়কে চলাচলের ওপর মোট ছয় দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। তবে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকটি আইনের ফাঁক গলে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে।

টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফৌজিয়া হাবিব টাইমসকে জানান, ট্রাকটি চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিল। ভোর সাড়ে চারটার দিকে যানটি যমুনা সেতু সংযোগ সড়কের কালিহাতীর সরাতইল এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। মুহূর্তের মধ্যে ট্রাকটি মহাসড়ক থেকে ছিটকে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়।

অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া যাত্রী আব্দুল রহমান বলেন, “হঠাৎ করেই ট্রাকটি প্রচণ্ডভাবে দুলতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এটি উল্টে যায়। এরপর চারদিকে শুধু চিৎকার আর কান্না। লোহার ভারী রডের নিচে চাপা পড়ে অনেকেই পিষ্ট হন।”

খবর পেয়ে এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। স্টেশন অফিসার আতোয়ার রহমান টাইমসকে জানান, উদ্ধারকর্মীরা দুর্ঘটনাস্থল থেকে ১৫টি লাশ উদ্ধার করেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে ৯ জন আহত যাত্রীকে উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।

নিহত ও আহতদের সবাই একসাথে নোয়াখালীর চৌমুহনী এলাকায় পুরোনো মোবাইল ফোন কেনার ফেরিওয়ালা হিসেবে কাজ করতেন। তারা একসাথে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় নিজ নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিহতদের মধ্যে ৯ জনের বাড়ি একই ইউনিয়নে। নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের বাসিন্দা মৃত ছয়জন হলেন: মোহাম্মদ তারেক, মোহাম্মদ আব্দুল বারেক, মোহাম্মদ বাদশা, মোহাম্মদ সোহাগ, মোহাম্মদ রবিউল এবং মোহাম্মদ সাগর। একই ইউনিয়ন মুর্শিদপুর গ্রামের মোহাম্মদ মাইনুর ইসলাম এবং পাকুড়িয়া গ্রামের দুই ভাই মোহাম্মদ মাইনুল ও মোহাম্মদ গিয়াসকে হারিয়েছে।

এই দুর্ঘটনায় দুই জোড়া বাবা-ছেলেও প্রাণ হারিয়েছেন। তারা হলেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার শরিকুল ও তার বাবা সাইদুল এবং রাজশাহীর তানোরের ইসমাইল হোসেন ও তার বাবা আলতাফ হোসেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের নজরুল এবং দিনাজপুর সদর উপজেলার মামুনও এই দুর্ঘটনায় মারা যান।

নিহত তারেকের শোকগ্রস্ত পিতা সুলতান হোসেন টাইমসকে বলেন, লোকাল বাসগুলো প্রতি সিটের জন্য এক হাজার ৮০০ টাকা করে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছিল। টাকা বাঁচাতে তারা সবাই মিলে পণ্যবাহী ট্রাকে ওঠার সিদ্ধান্ত নেয়।

কান্নায় ভেঙে পড়ে সুলতান বলেন, “সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়েই আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।”