শিশু হত্যাসহ নিষ্ঠুরতম অপরাধ বেড়েই চলছে। এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে মাদক। ভয়ংকর অপরাধীর সহজপথ্য হলো মাদক। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এমন অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেছেন, নিষ্ঠুরতম শিশু হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সমাজের সর্বস্তরে মূল্যবোধ চর্চার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এধরনের চরম নিষ্ঠুর অপরাধ রোধ করা সম্ভব।
একজন মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবীর মতে, শিশু হত্যা ও ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত এবং কার্যকর করা ছাড়া এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অন্যথায় শিশু রামিসার মতো হূদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একের পর এক ঘটতেই থাকবে।
এদিকে রাজধানীর পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড নিয়ে গতকালও ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। এসব সমাবেশের একটাই দাবি: রামিসার মতো আর একটি শিশুও যেন এই ধরনের নারকীয় হত্যাকাণ্ড কিংবা ধর্ষণের শিকার না হয়। সমাবেশে রামিসার খুনি সোহেল রানার দ্রুত চরম শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।
একটি মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যানুযায়ী গত চার মাসে ১১৮টি কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার এবং খুন হয়েছে ১৭ জন। মনোরোগ চিকিত্সকগণ বলেন, শিশু কিংবা অন্যান্য বয়সিদের ধর্ষণ করে হত্যার প্রায় প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। যারা মাদক সেবন করে তারা মানুষ থাকে না। তাদের আচার ব্যবহার দানবের মতো। একজন পেশাদার খুনির যে আচরণ, একজন মাদকাসক্ত কিশোর তরুণ যুবকেরও একই আচরণ।
সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক হারে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক আসছে। এর মধ্যে
ইয়াবা আসার পরিমাণ সর্বাধিক। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এমন স্থান নেই যেখানে ইয়াবা পাওয়া যাবে না। গ্রামে ‘বাবা’ হিসেবে সকল বয়সি নারী-পুরুষের কাছে এটি পরিচিত। এমন কোনো পাড়া মহল্লা নেই যেখানে ইয়াবা পাওয়া যাবে না। অর্থাত্ হাত বাড়ালে ইয়াবা পাওয়া যায়। মোটরসাইকেলযোগে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা মাদক বেচাকেনা চলছে। ফোন করলে মোটরসাইকেল দিয়ে দ্রুত পৌঁছে দেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ঘর থেকে ইয়াবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সন্তান লেখাপড়া করে কি না, সময়মতো স্কুল-কলেজে ঠিকমতো যায় কি না এবং তার চলাফেরার প্রতি নজর রাখতে হবে অভিভাবকদের। যেভাবে দেশব্যাপী মাদকের বিস্তার ঘটেছে তাতে সামাজিক আন্দোলন এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত মাদক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয় বলে দুই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা জানান।
দুই চিকিত্সকের মতে, ছাত্রছাত্রী ছাড়াও এমন কোনো পেশার লোক নেই মাদকাসক্ত নেই। এই সর্বনাশা মাদকের ছোবল থেকে তরুণ সমাজসহ সকল বয়স এবং পেশার মানুষ রক্ষা করতে হলে মাদককে না বলতে হবে। তাদের মতে একা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ঘর থেকে শুরু করে সমাজের ও সকল পেশার মানুষ মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
দেশের অন্যতম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, কিশোর থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দপ্তর থেকে এমন সব নারী-পুরুষ মাদকাসক্ত হয়ে তার কাছে চিকিত্সা নিতে আসেন, তাদের পরিচয় ও আচরণ দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের কথা হিংস্র, কঠোর মনোভাব, যখন তখন সে কাউকে খুন করতেও যেন দ্বিধা করবে না। মাদক গ্রহণ করতে করতে তারা দানব হয়ে গেছে। দানবরা যে কর্মকাণ্ড করতে পারে মাদকাসক্তরা একই ঘটনা ঘটাতে পারবে। তার মতে, বর্তমানে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই সর্বাধিক।
আগারগাঁও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান বলেন, মাদক হলো রাসায়নিক পদার্থ। ক্রমাগত মাদক গ্রহণ করলে মস্তিস্কের কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন রোগের উপসর্গের সৃষ্টি হয়। বিষণ্নতা, গুরুতর মানসিকসহ বিভিন্ন ধরনের রোগের সৃষ্টি। নৈতিকতা বিবেক বুদ্ধি চিন্তাশক্তির জায়গা নষ্ট হয়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সম্প্রতি শিশু ধর্ষণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার করতে সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাদকাসক্ত ব্যক্তির মধ্যে বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শাস্তির ভয় না পাওয়াসহ নানা কারণে অপরাধ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। সকল পর্যায় থেকে অপরাধীরা চাপের মধ্যে থাকলে অপরাধ প্রবণতা কমবে বলে তিনি জানান।