Image description

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের নেতৃত্বে সুশীল সমাজের একটি অংশের চাপেই এক-এগারোর সময় বেগম খালেদা জিয়া, তাঁর ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এক-এগারোর দুই কুশীলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন এবং মেজর জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ গোয়েন্দাদের কাছে এ তথ্য জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে দুজনই এক- এগারোর মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে মতি এবং মাহফুজের নাম উল্লেখ করেছেন।

এক-এগারোর অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি জেনারেল মাসুদ উদ্দিন রিমান্ডে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। একাধিক গোয়েন্দা সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, সেনাবাহিনী বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পক্ষে ছিল না। কিন্তু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিশেষ করে দুই সম্পাদক তাঁদের গ্রেপ্তারের জন্য রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতার ভিত্তিতে।

উল্লেখ্য, গত ২৩ মার্চ দিবাগত রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২৪ মার্চ পল্টন মডেল থানার মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন আদালত। পরবর্তীতে গত ২৯ মার্চ দ্বিতীয় দফায় তার ফের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

গত ৪ এপ্রিল তৃতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। সর্বশেষ গত ৭ এপ্রিল পল্টন মডেল থানার মামলায় তিন দফায় ১৪ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ওই দিন দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

গত ১১ এপ্রিল এক-এগারোর আলোচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ফের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাকে মূলত ২০০৭ সালের এক-এগারোর ষড়যন্ত্র নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

মাসুদ উদ্দিন বলেন, ২০০৬ সালের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। তখন তিনি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশন অর্থাৎ নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। নানা কারণেই এই ডিভিশনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ডিভিশনকে বলা হয় সেনাবাহিনীর অন্যতম স্তম্ভ। মাসুদ বলেন, এ সময় তিনি একজন সম্মানিত সম্পাদকের ফোন পান। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের এই সম্পাদক তার সঙ্গে একান্তে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মাসুদ বলেন, সাভার সেনানিবাসে তাকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি রাজি হননি। তিনি আমাকে গুলশানের একটি বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করি। মাসুদ বলেন, ২০০৬-এর অক্টোবরে গুলশানে একজন শিল্পপতির বাসায় আমি সস্ত্রীক যাই। ওই শিল্পপতি দুটি প্রভাবশালী সংবাদপত্রের মালিক।

সেখানে আমি আরও কয়েকজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচিত হই। তাদের মধ্যে প্রথম আলো সম্পাদক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, লেখক এবং বুদ্ধিজীবী ছিলেন। সেখানে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। নৈশভোজের ফাঁকে দুই সম্পাদক এবং একজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী আমার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় অংশ নেন। মাসুদ দাবি করেন, এ আলোচনায় রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। জেনারেল মাসুদ গোয়েন্দাদের কাছে দাবি করেছেন, আমি তিনজনকেই বলি সেনাবাহিনী চলে চেইন অব কমান্ডে, তাই এ বিষয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাদের আলোচনা করা উচিত। তারা মাসুদকে জানান, সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। তিনি আপনার ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত নন। মাসুদ বলেন, এ সময় আমি বলি সেনাপ্রধান সেনাবাহিনী এবং দেশের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নেবেন আমি তা পালন করব।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ওই নৈশভোজের এক দিন পরই সেনাপ্রধান তাকে ফোন করেন এবং জরুরি বৈঠকের জন্য সেনা সদরে আসতে বলেন। মাসুদ বলেন, মইন তার ভালো বন্ধু হলেও সেনাপ্রধান হওয়ার পর তার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে সেনা সদরের বৈঠকে তাদের দূরত্ব কমে যায় বলে মাসুদ জানান। ওই বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। মইন তাকে জানান যে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করবে না। মাসুদ এ তথ্য বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেন, ২২ জানুয়ারির নির্বাচন যদি আওয়ামী লীগ বর্জন করে তাহলে সেনাপ্রধান যে সিদ্ধান্ত নেবেন তা আমি মেনে নেব। মাসুদ বলেন, এরপর দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। রিমান্ডে তিনি বলেন, ৮ জানুয়ারি সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে আমরা ইয়াজউদ্দিনের সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করি। মাসুদ দাবি করেন, সেনাবাহিনীতে তিনি সেনাপ্রধানের চেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন। এজন্য এক-এগারোর সময় তাকে সামনে রেখে মইন সবকিছু করেছিলেন।

রিমান্ডে মাসুদ উদ্দিন দাবি করেন, তিনি নিজে বা সেনাবাহিনী বেগম জিয়ার পরিবারকে গ্রেপ্তার করার পক্ষে ছিলেন না। কোর কমান্ডের বৈঠকে তাদের গৃহবন্দি অথবা বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিশেষ করে দুই সম্পাদক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম তাঁদের গ্রেপ্তারের জন্য রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করেন। মাসুদ দাবি করেন, আমি তাদের বলেছিলাম, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁকে আপামর সেনা সদস্যরা শ্রদ্ধা করেন। জিয়া পরিবারকে গ্রেপ্তার করা হলে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়, দুই নেত্রীকে না সরালে দেশে রাজনৈতিক সংস্কার অসম্ভব। মাসুদ বলেন, আমি তখন দুই সম্পাদককে এ বিষয়ে জনমত তৈরি করতে বলেছিলাম। এরপর দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে দুটি সংবাদপত্র একাধিক সংবাদ প্রকাশ করে।

মতিউর রহমানের স্বনামে লেখা ‘দুই নেত্রীকে সরে দাঁড়াতে হবে’ শিরোনামে লেখাটিই এক-এগারো সরকারের পথ নির্দেশনা। মাসুদ উদ্দিন দাবি করেছেন, এক-এগারোতে সবকিছুই করা হয়েছে মতিউর রহমান, মাহফুজ আনামের নেতৃত্বে সুশীল সমাজের পরামর্শে। তিনি বলেন, এক-এগারোর পটভূমি তৈরি করতে ২০০৫ সাল থেকে পত্রিকা দুটি নিয়মিতভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে সংবাদ ও কলাম লিখতে থাকে।

২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারিতে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মোট ১৬ জন উপদেষ্টার মধ্যে ৯ জনই সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দুটি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন অথবা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। তাদের দিয়ে ওই সংবাদপত্র দুটি নিয়মিত গোলটেবিল বৈঠক, আলোচনা সভার আয়োজন করত। এদের মধ্যে ছিলেন এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম, আইয়ুব কাদরী, ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী, চৌধুরী সাজ্জাদুল করিম (সি এস করিম), এ এম এম শওকত আলী (সাবেক সচিব), রাশেদা কে চৌধূরী, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। এ ছাড়াও হাসান আরিফ ছিলেন এই সংবাদপত্র দুটির আইনজীবী। গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী এই পত্রিকা দুটির বিভিন্ন প্রচারণায় জড়িত ছিলেন।

জেনারেল মাসুদ দাবি করেন, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একটি বিশেষ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০৬ সালের শুরু থেকে দেশের প্রভাবশালী একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক সুপরিকল্পিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার শুরু করে। তথাকথিত ‘যোগ্য প্রার্থী’ বাছাইয়ের নামে এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দেশব্যাপী সেমিনার এবং গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি করা।

মাসুদ দাবি করেন, ওই সময় কিছু প্রভাবশালী মহল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নির্দিষ্ট দিকে নিতে কাজ করেছিল। তার ভাষ্যমতে, একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সমালোচনার আড়ালে এমন একটি জনমত তৈরি করেছিল, যেখানে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তিনি অভিযোগ করেন, এ প্রক্রিয়ায় ‘বিরাজনীতিকরণ’ ধারণাটি সামনে আনা হয় এবং সেটিকে জনপ্রিয় করতে সংবাদ পরিবেশন ও বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গোয়েন্দারা মনে করছেন, এক-এগারো ষড়যন্ত্রের আসল রহস্য উদ্ঘাটন করতে হলে এই দুই সম্পাদককে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধি প্রথম আলো কার্যালয়ে মতিউর রহমানের বক্তব্যের জন্য গেলে জানানো হয় তিনি অফিসে নেই।