রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন (২৭) নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (২২ মে) দুপুরে তার মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার নিশ্চিত হয়েছে। নিহত জাহাঙ্গীর উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল-বাগপাড়া গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত ১৮ মে ইউক্রেন সীমান্ত এলাকায় রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে মাইন বিস্ফোরণে তিনি মারা যান। একই ঘটনায় আরও দুই বাংলাদেশি নিহত এবং একজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভাগ্য ফেরাতে বিদেশ যাত্রা, অতঃপর যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে
নিহত জাহাঙ্গীরের বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং মা জাকিয়া বেগম পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন। করোনাকালে পরিবারটি ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। এসএসসি পাস করার পর জাহাঙ্গীর একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। পরে স্ত্রী মাশুকা হোসাইনকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করলেও আর্থিক সংকটের কারণে আবারও গ্রামে ফিরে আসেন।
অবশেষে ৪ মাস আগে ভালো চাকরির আশায়, শ্বশুরবাড়ির আর্থিক সহায়তায় রাশিয়ায় যান জাহাঙ্গীর। তবে পরিবারের অভিযোগ, সেখানে নেওয়ার পর তাকে ভালো কাজের পরিবর্তে জোরপূর্বক ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
সহকর্মীর ভিডিও বার্তা ও এজেন্সির প্রতারণা
জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই জাভেদ জানান, তার ভাইয়ের বন্ধু মৃদুল ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। মৃদুল বর্তমানে রাশিয়ার একটি সেনা ক্যাম্পে কর্মরত এবং তার বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়।
জাভেদ বলেন, “১৮ মে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে চার বাংলাদেশির মধ্যে তিনজন নিহত এবং একজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন ড্রোন হামলায় এবং দুজন মাইন বিস্ফোরণে মারা যান। লাশ এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে রয়েছে।”
নিহত অপর দুজন হলেন— মাদারীপুরের মো. সুরুজ কাজী ও কুমিল্লার মো. ইউসুফ খান। ভিডিও বার্তায় মৃদুল দাবি করেন, ‘আরাফা আল মনোয়ার এজেন্সি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভালো চাকরির কথা বলে তাদের রাশিয়ায় নেয়। পরে বিভিন্ন কৌশলে প্রতারণা করে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। তিনি এই নির্মম ঘটনার জন্য সরাসরি ওই এজেন্সিকেই দায়ী করেন।
পিগ ফার্ম থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাশিয়ায় নেওয়ার পর প্রথমে জাহাঙ্গীরকে একটি পিগ ফার্মে কাজ দেওয়া হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবার না পেয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে রেস্টুরেন্টে ভালো চাকরির আশ্বাস দিয়ে জাহাঙ্গীরসহ সাত জনকে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে জোরপূর্বক তাদের কাগজে-কলমে নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। প্রায় দুই মাস সামরিক প্রশিক্ষণের পর সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হলে মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যেই প্রাণ হারান জাহাঙ্গীর।
জাহাঙ্গীরের শ্বশুর রফিকুল ইসলাম বলেন, “রাশিয়া সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আমরা পরে জানতে পারি। আমি তাকে বলেছিলাম, যেভাবেই হোক দেশে ফিরে আসতে। কিন্তু সে আর ফিরতে পারেনি।” তিনি আরও জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পরিবারের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের শেষ কথা হয়। তখন জাহাঙ্গীর জানিয়েছিলেন যে, তিনি কিছুদিন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকবেন।
বাড়িতে মাতম, বুক ফাঁটা আর্তনাদ
শুক্রবার বিকালে জাহাঙ্গীরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। মা জাকিয়া বেগম ছেলের জন্য বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। জ্ঞান ফিরলেই ছেলের নাম ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি আর কিছু চাই না। টাকা-পয়সা লাগবে না, আমার ছেলেটারে শুধু ফেরত চাই।”
অপরদিকে আড়াই বছরের ছেলে আজানকে কোলে নিয়ে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মাশুকা হোসাইন বলেন, “ভালো চাকরি করে সংসারের ভাগ্য ফেরাতে রাশিয়া গিয়েছিল। কিন্তু তাকে যুদ্ধে পাঠানো হলো। এই যুদ্ধে শুধু সে না, আমরাও যেন শেষ হয়ে গেলাম।”
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরানুল কবির বলেন, “অফিসিয়ালি কোনও তথ্য না পেলেও পরিবারের কাছ থেকে আমরা মৃত্যুর খবর জেনেছি। তিনি রাশিয়া সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।”