বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর ঝিগাতলা মোড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মনেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল মোতালিব (১৪)। সেই ঘটনায় ২৬ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন মোতালিবের বাবা আব্দুল মতিন। একই ঘটনায় ঐ বছরের ৩০ অক্টোবর আদালতে একটি মামলার অভিযোগ দেন শেখ মুহাম্মদ মাছুম বিল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। মামলাটি হাজারীবাগ থানায় হত্যা মামলা হিসেবে দায়ের করার নির্দেশ দেয় আদালত। মাছুম বিল্লাহ ভিকটিমের নাম উল্লেখ করেন আব্দুল মোতালেব মুন্না। তার বয়স উল্লেখ করেন ১২ বছর। বাদীর সঙ্গে ভিকটিমের কোনো সম্পর্ক নেই। শিক্ষার্থী মোতালিবের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায়। আর নতুন মামলার বাদী শেখ মাছুম বিল্লাহর বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরে।
আব্দুল মতিন এজাহারে ১৭৭ জন আসামির নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানকে পুলিশ এই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে। অন্যদিকে মাছুম বিল্লাহ যে অভিযোগ দিয়েছেন, সেখানে আসামি করেছেন ২০ জনকে। তাদের কারো বাসা ঐ এলাকায় নয়, অধিকাংশ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তও নয়। আসামিদের মধ্যে পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডেও নিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান দখলে নেওয়ার জন্য এই মামলা বলে আসামিদের অভিযোগ। সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানটি মাছুম বিল্লাহ দখল করেছেন বলে জানা গেছে।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক প্রচার সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা এম এ রাজ্জাক ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানটি দখলে নেওয়ার জন্য মাছুম বিল্লাহ এই মামলা করেছেন। ঐ মামলার পর ডিবির একজন এসআই এসে আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে দুই জনকে ধরে নিয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি মাছুম বিল্লাহর হাতে তুলে দিয়েছে। এখন এদের অন্য মামলায়ও ফাঁসানো হবে বলে টাকা চাচ্ছে পুলিশ। বিষয়টি আমি পুলিশ কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেছি।
নিহত শিক্ষার্থীর বাবা আব্দুল মতিন ইত্তেফাককে বলেন, ছেলে হত্যার ঘটনায় আমি নিজে মামলা করেছি। অন্য কেউ কেন মামলা করবে? আমি ঐ ব্যক্তিকে চিনি না। তিনি নিশ্চয় ভালো উদ্দেশ্যে এই মামলা করেননি। হাজারীবাগ থানার ওসি ফোন করে আমাকে জানিয়েছেন মামলার কথা। আমি নিজেও যে মামলাটি করেছি, সেখানে ছাত্ররাই আসামিদের নাম উল্লেখ করেছে। আমি এদের কাউকে চিনি না। তারপরও এই মামলা বাদী আমি।
মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে আব্দুল মতিন বলেন, থানা থেকে মামলাটি ডিবিতে পাঠানো হয়েছিল। কিছু দিন আমি ডিবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাইনি। এরপর থেকে কেউ আমার সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি। ফলে বিচারের ভার আমি আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিয়েছি। হাজারীবাগ থানার মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওখান থেকেও এখন আর কেউ যোগাযোগ করে না। মনে হয়, ঐ মামলাটিও ওভাবেই পড়ে আছে। তদন্ত শুরু হলে তো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করত?
একইভাবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৫ আগস্ট ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় কিশোর মাহমুদুল হাসান। মাসখানেক পর ১২ সেপ্টেম্বর তার বাবা রিকশাচালক মিজানুর রহমান ঢাকার আদালতে যান ছেলে হত্যার ঘটনায় মামলা করতে। আদালত তার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে। পরে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ আদালতকে জানায়, ঐ ঘটনায় আগেই একজন মামলা করেছেন। ফলে বাবার আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এরপর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, মাহমুদুল (১৫) হত্যায় একটি নয়, আগেই দুটি মামলা হয়েছে। এর একটি ডেমরা থানায়, তাতে আসামি করা হয় ৯৩ জনকে। এতে বলা হয়, মাহমুদুলকে ডেমরা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। অপর মামলাটি যাত্রাবাড়ী থানায়, তাতে আসামি করা হয় ৩৭ জনকে। এই মামলায় বলা হয়, মাহমুদুলকে হত্যা করা হয়েছে যাত্রাবাড়ীতে। দুই মামলায় দুই থানার পুলিশ দুজনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডেও নিয়েছে।
এই দুই মামলার বাদীদের চেনেন না মাহমুদুলের বাবা মিজানুর রহমান। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আমার ছেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হলো। কিন্তু আমি মামলা করতে পারিনি। ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী থানার দুই মামলা এবং ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে বাবার করা মামলার আবেদন তিনটির এজাহারে ঘটনাস্থল নিয়ে তিন রকম তথ্য দেওয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা মিজানুর রহমান ও হাসি বেগম দম্পতির সন্তান মাহমুদুল হাসান। কয়েক বছর আগে মিজানুর ও হাসি বেগমের ছাড়াছাড়ি হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় নানির কাছে বড় হয় মাহমুদুল।
মিজানুর রহমান বলেন, তার ছেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। তিনি নিজেও যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে অংশ নেন। মাহমুদুল ৫ আগস্ট সকালে সানারপাড়ের বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যায় খবর পান, যাত্রাবাড়ীতে তার ছেলের মাথায় গুলি লেগেছে। মরদেহ রয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে। এ ঘটনায় প্রথম মামলাটি করেন ডেমরা এলাকার বাসিন্দা জুলহাস শেখ। তিনি ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে করা আবেদনে আসামি হিসেবে ৯৪ জনের নাম উল্লেখ করেন। এজাহারে দাবি করা হয়, নিহত মাহমুদুল বাদীর ভাগনে হয়। অথচ মিজানুর রহমান এই জুলহাসকে চেনেন না।
একই ঘটনায় ১০ সেপ্টেম্বর সিএমএম আদালতে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আবেদন করেন রবিউল আওয়াল নামের এক ব্যক্তি। ১৮ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। মামলার বাদী রবিউল আওয়াল মাহমুদুলের কোনো আত্মীয় নন। মাহমুদুলের মা-বাবা কেউই মামলা করেননি বলে তিনি এই মামলা করেছেন। পরে মামলা থেকে দুই ব্যবসায়ীর নাম প্রত্যাহার চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন বাদী রবিউল আওয়াল। তার দাবি, আইনজীবীর ভুলে ঐ দুই ব্যবসায়ীর নাম মামলায় উল্লেখ করা হয়েছিল।
একইভাবে সাভারের রেডিও কলোনির নয়াবাড়ি পেট্রোল পাম্পের সামনে গুলিতে মারা যান আল আমিন (৩৮) নামে একজন হকার। এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সুমী (৩৬) বাদী হয়ে মিরপুর থানায় ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলা করেন। আবার আল আমিন নিহতের ঘটনায় ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি সাভার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এই মামলার বাদী আবু হানিফ সেলিম। তার বাড়ি রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ১৬ নম্বর খাগড়াছড়ি গ্রামে। অথচ নিহত আল আমিনের বাড়ি মাগুরা জেলার সদর উপজেলার পারনান্দুয়ালি গ্রামে। নিহত আল আমিনের সঙ্গে আবু হানিফ সেলিমের কোনো সম্পর্ক নেই।
আল আমিনের স্ত্রী সুমীর মামলার তদন্ত করতে গিয়ে মিরপুর থানার এসআই রোকনুজ্জামান দুটি মামলার সন্ধান পান। এরপর তদন্ত থামিয়ে তিনি আদালতে পুরো বিষয়টি উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেছেন, আল আমিন সাভারে মারা গেলেও তার স্ত্রী ভুল তথ্য দিয়ে বলেছেন, তিনি মিরপুর ১০ নম্বরের ফায়ার সার্ভিসের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। অথচ আবু হানিফ যে মামলাটি করেছেন সেখানে তিনি সঠিক তথ্য উল্লেখ করলেও কেন তিনি এতদিন পর এই মামলা করলেন তা পরিষ্কার নয়। এজাহার থাকা ফোন নম্বরে যোগাযোগ করেও আবু হানিফকে পাওয়া যায়নি। নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বর্তমান ঠিকানা সাভারের জালেশ্বরে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, অনেকগুলো ঘটনায় এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এখন তদন্তে গিয়ে সত্য উদ্ঘাটিত হবে। আমরা দেখেছি, ৫ আগস্টের আগের অনেকগুলো ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটা মামলা করেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পরিবার মামলা করতে গিয়ে দেখে পুলিশ মামলা করেছে। পুলিশের মামলায় আসামি করা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের। ফলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। মামলাগুলো একত্রিত করে তদন্তে সত্য বের করতে হবে। যাতে প্রত্যেকের পরিবার ন্যায় বিচার পায়।
সিনিয়র আইনজীবী সাইদ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, মিথ্যা অভিযোগকারী কিংবা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, ঐ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে হবে। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের যদি মনে হয়, আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা, ভিত্তিহীন, তুচ্ছ, বিরক্তিকর বা হয়রানিমূলক এবং আসামির প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে মামলাটি করা হয়েছে, তাহলে এ ধরনের মামলা মিথ্যা মামলা হিসেবে গণ্য হবে। মামলা মিথ্যা বা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগকারী বা মামলা দায়েরকারীকে দণ্ড দিতে পারেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিও মামলা করতে পারেন।
মামলা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন। এমনকি আদালত মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারেন। আমলযোগ্য নয়, এ রকম কোনো মামলায় কোনো পুলিশ কর্মকর্তা মিথ্যা প্রতিবেদন দিলে তার বিরুদ্ধেও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারেন।