Image description
পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদল : বক্তব্যে অস্বস্তি

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রায় তলানিতে গিয়েছিল। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে এই সম্পর্ককে নতুন করে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল ঢাকা ও দিল্লির। বিএনপি সরকার গঠনের আগে ও পরে এর বহিঃপ্রকাশও দেখা গেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের শুরু থেকেই বাংলাদেশ বিষয়ে নানা নেতিবাচক ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করেন বিজেপির প্রার্থী ও বর্তমানে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ঘোষণা, অবৈধ ভারতীয়দের বাংলাদেশে পুশব্যাকসহ নানা ইস্যুতে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। এমন পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করতে বাধ্য হন। পশ্চিমবঙ্গ নেতাদের একের পর উসকানিমূলক বক্তব্যে একপর্যায়ে মুখ খোলেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশিদের হত্যার ঘটনায় তিনি তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি তিনি এও বলেন যে, ভারতের সঙ্গে আগামীর সম্পর্ক কেমন হবে তা গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়নের ওপর নির্ভর করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ফখরুলের এই বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন। তাদের মতে, ফখরুলের মুখ থেকে ভারত সম্পর্কে কথায় কথায় নেতিবাচক বক্তব্য দেওয়ার নজির কম। ফলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা বক্তব্য দুদেশের সম্পর্কোন্নয়নের পথে বাধা কিনা এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা উঠছে। বলা হচ্ছে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অগ্রগতিতে নতুন করে অস্বস্তি ছড়াচ্ছে এসব বক্তব্য। নতুন সরকারের সময় দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক নতুন করে বাঁক নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও এসব কারণে তা পিছিয়ে যেতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। তবে তারা বলছেন, দুদেশের সুসম্পর্ক উভয়ের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনকও।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের বাস্তবতা হলো, কেউ কাউকে বাদ দিয়ে চলার সুযোগ নেই। আমাদের দিক থেকে গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের বিষয়টি আছে। এটি বাংলাদেশ ও ভারত দুদেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা পদ্মা ব্যারাজ তৈরি করার জন্য এখন সচেষ্ট। এখানেও পানিপ্রবাহ নিশ্চিতে ভারতকে প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে ও পরে আমরা কিছু জাতিগত বিদ্বেষমূলক বিষয় দেখেছি। বাংলাদেশ থেকেও কিছুটা এসেছে। কিন্তু বাস্তবতাকে মেনেই দুদেশের এগিয়ে যাওয়া উচিত হবে। দুদেশেরই স্বার্থ একজনের সঙ্গে আরেকজনের মিশে আছে।

তাই খুব সুচিন্তিতভাবে বিষয়টি মাথায় রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই উভয়ের জন্য লাভজনক হবে। কথাবার্তার ক্ষেত্রে দুদেশের সবারই সাবধানতা দরকার।

তিনি বলেন, ২০২৪-এর পরে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা এবং ভারতের দিক থেকে এই পরিস্থিতিকে অ্যাডজাস্ট করা দুটোই একটি চ্যালেঞ্জিংয়ের জায়গা। বর্তমান সরকার সব বিষয়কে মাথায় রেখে নতুনভাবে সম্পর্কটি কিভাবে স্বাভাবিক এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে তা নিয়ে কাজ করা উচিত।

এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলিমদের তাড়িয়ে দেওয়ার কথা এসেছে বিজেপির নেতাদের বক্তব্যে; যা সেখানে সাম্প্রদায়িকতার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গরুর মাংসের দোকান বন্ধ করা হয়েছে। মুসলিমদের নানা ভাবে অপমান, তিরস্কার করা হচ্ছে। গরু কুরবানি করা যাবে না এমন নিষেজ্ঞাধাও দেওয়া হয়েছে, যা সেখানকার অনেক হিন্দু গরু ব্যবসায়ীদেরকেও বিপাকে ফেলেছে।

এসব কারণে ভারতকে সতর্ক করে দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, পার্শ্ববর্তী দেশ আমাদের প্রতিবেশী। প্রতিবেশীকে সম্মান করি। আমরা চাই, আপনারা শান্তিতে থাকুন।

আমরা চাই না ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে বিভাজন এবং অশান্তি হোক। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে শুধু মুসলিম নামের মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হচ্ছে। বন্ধু, এটা তিতুমীরের বাংলাদেশ। হাজি শরীয়তউল্লাহর বাংলাদেশ। শাহ মখদুমের বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙাবেন না। হুমকি-ধমকি দেবেন না।

তিনি এ সময় আরও বলেন-আমরা চাই, আমরা শান্তিতে থাকি, আপনারাও শান্তিতে থাকুন। আমাদের শান্তি নিয়ে টান দিলে কারও শান্তিই থাকবে না। তিনি গঙ্গা ও তিস্তা পানিচুক্তির বিষয়টিও তুলে ধরেন।

তবে রাজনীতিক কারণে নানা বক্তব্য আসলেও দুদেশকেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে সম্পর্কোন্নয়নে জোরদার করতে হবে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রত্যেকে আশা করেছিল বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে যে টানাপোড়েন ছিল তা চলে যাবে এবং ক্রমান্বয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ভারতের দিক থেকে নতুন সরকার গঠনের পর শুভেচ্ছা জানানো থেকে শুরু করে সবকিছুই ইতিবাচক ছিল। কিন্তু মনে হয়েছে, সরকার যে সুযোগটা গ্রহণ করেনি। সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশের দিক থেকে যে সক্রিয় হওয়া, সেটি খুব একটা দেখা যায়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করেছেন। কিন্তু সফরটি ঠিক দ্বিপাক্ষিক সফরের মতো ছিল না। আলাপ আলোচনায় কোনো এজেন্ডা ছিল না। কোন বিষয়ে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা আমরা জানতে পারিনি। অনুমান করা যায় সেগুলোও কিছু হয়নি। তাই আমরা যেহেতু সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে চাই সেহেতু আমাদের দিক থেকে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।

তিনি বলেন, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আবার উসকানিমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকারের দিক থেকে যদি এই বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া না হয় এবং বিষয়টি সাধারণ মানুষের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়-তাহলে উসকানিমূলক ও দায়িত্বহীন আচরণে উভয়পক্ষরই ক্ষতি করতে পারে। তেমনটা হলে সম্পর্কোন্নয়নের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল তা অনেকটা পিছিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু এটি দুদেশের কারও জন্যেই লাভজনক হবে না। সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, সন্দেহ হয়, শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বা কথা বলার উত্তেজনা তৈরির মধ্যেই বিষয়গুলো সীমাবদ্ধ নেই। হয়তো অন্য কোনো পরিস্থিতি তৈরির জন্য ব্রাকগ্রাউন্ড হিসাবে সম্পর্কের এসব উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে। সম্পর্কের অবনতির জন্যও উত্তেজনা তৈরি করা হতে পারে।

এদিকে, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের সীমান্ত সুরক্ষা এবং অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে একাধিকবার কঠোর বার্তা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেছেন, তার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল, সিপিএম বা কংগ্রেসের চেয়ে বাংলাদেশে জামাতিদের ‘চিড়বিড়ানি’ বা অস্বস্তি অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

সোমবার সন্ধ্যায় কলকাতার ভবানীপুর ও ক্যামাক স্ট্রিটে আয়োজিত ধন্যবাদ জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে তিনি অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

তিনি বলেন, সীমান্ত সুরক্ষিত করা, অ-ভারতীয়দের দরজা দেখিয়ে দেওয়া এবং অনুপ্রবেশকারীদের হটিয়ে যেখান থেকে এসেছিল সেই রাস্তা দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।

অবশ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এ ধরনের বক্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক কারণে এবং ভোটব্যাংক ধরে রাখতে এ ধরনের নানা বক্তব্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এসব থামানো যাবে না। তবে যেটি দেখা দরকার তা হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লেনদেনগুলো কোন অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, তবে ভারতের দিক থেকে সব ধরনের ভিসা এখনো বাংলাদেশিদের জন্য চালু করা হয়নি। এটি হওয়া জরুরি।