প্রবাসী মোকাররম হত্যাকাণ্ড সিনেমার গল্পকেও যেন হার মানায়। প্রবাস থেকেই মোকাররম প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন একই গ্রামের আরেক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে। প্রেমিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে স্ত্রীকে না জানিয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছিলেন মোকাররম। ওদিকে প্রেমিকা তাসলিমাও গ্রাম থেকে চলে আসেন রাজধানীতে। দু’জনই ওঠেন প্রেমিকার বান্ধবীর মান্ডার বাসায়। একপর্যায়ে অনৈতিক সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে তাদের মধ্যে বচসা শুরু হয়।
এ সময় প্রেমিকা তাসলিমা ও তার বান্ধবী হেলেনা মিলে নৃশংসভাবে হত্যা করেন মোকাররমকে। এরপর পৈশাচিক কায়দায় লাশ ৮ টুকরো করে ফেলে দেয় এলাকার ময়লার ভাগাড়ে। হত্যার পর বাসার ছাদে বিরিয়ানি পার্টি করেন তারা। ঘটনার তিনদিন পর মান্ডা এলাকার একটি বাড়ির বেজমেন্ট থেকে পলিথিনে মোড়ানো মোকাররমের ৮ টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রধান আসামি হেলেনা বেগম (৪০) ও তার মেয়ে হালিমা আক্তার (১৩)কে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৩। তাদের বাড়ি নরসিংদী সদর উপজেলার নন্দরামপুর এলাকায়। তবে পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনা (৩১) এখনো পলাতক। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে গত সোমবার দুপুরে র্যাব-৩ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হয়। এতে র্যাব-৩ এর উপ- অধিনায়ক মো. সাইদুর রহমান জানান, নিহত মোকাররমের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর গ্রামে। তার বাবার নাম সোহরাব মিয়া। মায়ের নাম সামিনা বেগম। মোকাররম গত ৩ বছর ধরে সৌদি আরবে ছিলেন। তার স্ত্রী জোনাকি আক্তার একজন গৃহিণী। দুই ছেলে মুজাহিদ (৪) ও বায়জিদ (৬) মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতেই থাকে।
মোকাররমের পরিবার সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ ১৩ই মে ছেলেদের সঙ্গে মোবাইলফোনে কথা বলেন। তখন তিনি কাজে যাচ্ছেন, পরে বাসায় ফিরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি পরিবার। পরে গত রোববার রাতে আশুগঞ্জ থানা পুলিশ তাদের বাড়িতে গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে মোকাররমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাঠায়। মোকাররম যেদিন থেকে যোগাযোগের বাইরে, সেদিন থেকেই একই গ্রামের সেই প্রবাসীর স্ত্রীর বাড়িতেও তালা ঝোলানো ছিল।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর মোকাররমের মরদেহ আট টুকরো করা হয়। এরমধ্যে সাত টুকরো বাসার নিচে ময়লার স্তূপে ফেলে রাখা হয় এবং মাথার অংশ প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দেয়া হয়। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলোÑ ঘটনার পরদিন অভিযুক্ত হেলেনা বেগম, মেয়ে ও পলাতক তাসলিমা একটি হোটেলে গিয়ে বিরিয়ানি খান এবং রাতে বাসায় ফিরে ছাদে পার্টি করেন।
র্যাব-৩ এর উপ-অধিনায়ক মো. সাইদুর রহমান বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার সৌদি প্রবাসী মোকাররমের সঙ্গে একই গ্রামের বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী সুমনের সু-সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে সুমন সৌদি আরব থাকাকালীন সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সঙ্গে মোকাররমের পরিচয় হয়। পরিচয়ের একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তারা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলে কথা বলতো। মোকাররম প্রবাসে থাকাকালীন তার পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনাকে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ লাখ টাকা দেন।
গত ১৩ই মে কাউকে না জানিয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন মোকাররম। পরে তিনি তাসলিমার বান্ধবী হেলেনার মান্ডার ভাড়া বাসায় ওঠেন। হেলেনা বেগমের এক রুমের বাসায় তাসলিমা, মোকাররম, হেলেনা এবং তার দুই মেয়ে একসঙ্গে অবস্থান করেন। এ সময় ১৩ বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে মোকাররম অসামাজিক কার্যকলাপের চেষ্টা করলে তা দেখে ফেলেন হেলেনা। এ নিয়ে তাসলিমা ও মোকাররমের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে মোকাররম তাসলিমাকে দেয়া টাকা ফেরত দাবি করেন এবং আপত্তিকর ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন।
এরপর তাসলিমা ও হেলেনা মিলে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরদিন সকালে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয় তাকে। র্যাবের বর্ণনা অনুযায়ী, ওষুধের প্রভাবে মোকাররম ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে বালিশচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন হেলেনা। তবে মোকাররম প্রাণে বাঁচতে হেলেনার হাতে কামড় দেন। এ সময় তাসলিমা হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। মোকাররম তার হাত থেকে হাতুড়ি ছিনিয়ে নিয়ে উল্টো তাসলিমাকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। পরে হেলেনা পাশে থাকা বঁটি দিয়ে মোকাররমের গলায় কোপ দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন এবং তার মেজো মেয়ে মাটিতে পড়ে থাকা হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমের মাথায় আঘাত করেন।
র্যাবের এ কর্মকর্তা জানান, পরে তাসলিমা ধারালো বঁটি দিয়ে মোকাররমকে আরও তিন-চারবার আঘাত করেন। পরে সবাই মিলে মৃত্যু নিশ্চিত করে মোকাররমের মরদেহ বাথরুমে নিয়ে যান এবং রক্তমাখা ঘর পরিষ্কার করেন। এ ঘটনার পর ঘরের বাইরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কিছু সময় ঘোরাফেরা করেন তারা। বাইরে থেকে এসে মোকাররমের মরদেহ আট টুকরো করে প্রথমে পলিথিন ও পরে বস্তায় ভরে বাথরুমে রেখে দেন। মরদেহ প্রায় ১২ ঘণ্টা পলিথিনে রাখার পর গত ১৪ই মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সুযোগ বুঝে সাত টুকরো করে ভাড়া বাসার ভবনের নিচে ময়লার স্তূপে ফেলে দেন। মোকাররমের মাথার অংশ বাসা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দিয়ে আসেন। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার পরদিন ১৫ই মে সবাই মিলে বাইরে ঘুরতে যান এবং হোটেলে গিয়ে বিরিয়ানি খান। বাসায় এসে রাতে ছাদে পার্টি করেন এবং পার্টিতে প্রতিবেশীদেরও অংশ নিতে অনুরোধ করেন তারা।
সোমবার বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে একই দিন রাতে মরদেহ গ্রামে নিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত মোকাররমের বাবা সোহরাব মিয়া বলেন, আমার ছেলে ৩ বছর ধরে সৌদি প্রবাসী ছিল। আমার ছেলেকে লোভ-লালসা দিয়ে তারা হত্যা করেছে। তাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের আগে থেকে শত্রুতা ছিল। সে দেশে আসছে এটা আমরা জানতাম না। পুলিশ আমাদেরকে খবর দেয়ার পর আমরা জানতে পেরেছি। আমরা এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।
ওদিকে রাজধানীর মাণ্ডায় পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় সৌদি প্রবাসী মোকাররমের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামি হেলেনা বেগম আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় হেলেনার মেয়ে হালিমা আক্তারকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুগদা থানার উপপরিদর্শক এনামুল হক মিঠু তাদের আদালতে হাজির করেন। হেলেনা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তা রেকর্ড এবং হালিমাকে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে আটকে রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দীন আসামি হেলেনার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। অপরদিকে, ঢাকার ৫ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মনিরুজ্জামানের আদালত হালিমাকে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক মারুফুজ্জামান এই তথ্য নিশ্চিত করেন।