Image description

সরকার গঠনের পর থেকেই সচিবালয়ে নিয়মিতই দপ্তর করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্রটিতে প্রধানমন্ত্রী এবং সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় তথ্যের নিরাপত্তায় উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরইমধ্যে সচিবালয়ের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ১৬৯ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি করতে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি চালু করা হচ্ছে এআই-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ে মূল ফটক, বিভিন্ন দফতর এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা এই রদবদলের আওতায় পড়েছেন। এরইমধ্যে সচিবালয়ে মূল ফটক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের একটি তালিকাও চূড়ান্ত করে পুলিশ সদর দফতর ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন হয়। সেকারণেই সচিবালয়ের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সচিবালয় কমপ্লেক্সের ৯৯টি স্পটে এআই-চালিত নজরদারি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে সরকার। পাশাপাশি চারটি প্রধান প্রবেশদ্বারে উন্নত ব্যাগেজ স্ক্যানার, আর্চওয়ে এবং আধুনিক মাদক ও অস্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও থাকছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. জসিম উদ্দিন নিশ্চিত করে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে নিয়োগ পাওয়া অন্তত ১৬৯ জন পুলিশ সদস্যকে একযোগে সচিবালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

‘অনিয়ম, অবহেলা বা অদক্ষতার’ অভিযোগে অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। যদিও এই পদক্ষেপটি বৃহত্তর আধুনিকীকরণ এবং রোটেশন নীতিরই অংশ বলেই উল্লেখ করেন তিনি।

মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এই পুলিশ সদস্যদের কারও ৫ থেকে ৬ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একই জায়গায় থাকার কথা নয়।’ এই প্রক্রিয়াটিতে ‘সুপারিশ বা পক্ষপাতিত্বের’ কোনও সুযোগ থাকছে না বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অধীনে একটি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট বাংলাদেশ সচিবালয়ে নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকে। এই ইউনিটের সদস্যরা সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সুরক্ষা, মূল ফটকের নিরাপত্তা এবং ভিআইপি চলাচল নির্বিঘ্ন করার দায়িত্বে থাকেন। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে সোয়াট টিম ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী, মন্ত্রী, বিচারপতি, সংসদ সদস্য, সশস্ত্র বাহিনী প্রধান এবং সিনিয়র সচিবরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মী বা বন্দুকধারী দেহরক্ষী পেয়ে থাকেন। 

এই রদবদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এমন একটি সূত্র জানিয়েছে, তালিকায় থাকা পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দফতরের মাধ্যমে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ডিএমপি কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার আগে তাদের সার্ভিস রেকর্ড এবং সচিবালয়ে পদায়নের তারিখ পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে, এই উদ্যোগ নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তদবিরের চেষ্টাও করছেন পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কেউ কেউ বদলি ঠেকাতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের কাছে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবেদনশীল সরকারি স্থাপনায় দীর্ঘসময় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা কর্মীরা বাইরের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বা সংযোগ বিস্তৃতির ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে নিরাপত্তার দুর্বলতা তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, সংবেদনশীল সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে পর্যায়ক্রমে রদবদল একটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক চর্চা। তবে, শুধু পদায়নের মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে কোনো বদলির ব্যাপারে সতর্ক করেন তিনি।

মাহফুজুর রহমানের মতে, ‘প্রতিটি সদস্যের সার্ভিস রেকর্ড, পেশাদার দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং অতীতের পারফরম্যান্স পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।’

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সচিবালয়ে, বিশেষ করে কমপ্লেক্সের ১ নম্বর ভবন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত দপ্তর করেন; সেখানে যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং শক্তিশালী সার্ভিস রেকর্ডসহ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শিগগিরই সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন এমন কনস্টেবল, নায়েক, অ্যাসিস্টেন্ট সাব-ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর এবং পরিদর্শক পদের আরও পুলিশ সদস্য এ ধরনের বদলির মুখে পড়তে পারেন। 

তবে এ ধরনের উদ্যোগের সমালোচনাও করছেন সচিবালয়ে কর্মরতদের কেউ কেউ। তারা বলছেন, যাদের বদলি করা হচ্ছে, তাদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিলেন এবং পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক বলেন, ‘অল্পসংখ্যক কর্মীর কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাও দুর্ভোগে পড়ার আশঙ্কা করছেন।’