‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে, দেখো নাই?’ শিরোনামে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে। কীভাবে ফিরল, সে গল্পই বলব আজ।
লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ২৪–কে ৭১–এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থীদের উত্থানের জন্য অন্তরিণ সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেছে, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে। যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ।
লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে ‘মজলুমগণ’ চুপ ছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন সেকুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন এদেশে সরকার প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থানে ভয় পেয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন মবস্টারদের এদেশে হিরো বানানো হয়েছিল। উগ্রবাদীর সেফ স্পেইস দেয়া হইসিল।
লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যুনতম সংস্কার ও ‘ঐকমত্য কমিশন’ নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে বিএনপি ও * অন্তরীণ সরকারের বিরুদ্ধে গেল আর বিএনপি ও * ঠেকাতে জামাতকে কোলে নিল অন্তরিণ।
লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর মবে রূপ নিয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন মিডিয়া আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা প্রযোজিত হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরিণ সরকার পলিটিক্যাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হলো এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হলো। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামায়াত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল, নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা।
লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের বদলে সংঘতন্ত্র জয়ী হল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন নতুন মিডিয়া অনুমোদনে বাধা দেওয়ার জন্য একজোট হইসিল কিচেন ক্যাবিনেট। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন জুলাই ঘোষণাপত্র কিংবা সনদের প্রক্রিয়া তুলে দেয়া হইসিল আমলাতন্ত্র আর ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপের হাতে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন বাম-শাহবাগী পিটাইলে আনন্দ পেয়েছিল মজলুমগণ।
লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন এদেশে কাওয়ালি/ইনকিলাবি কালচারের মতন রিগ্রেসিভ কালচার–ব্যবস্থা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোকাবেলার মহারম্ভ হয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন নির্বাচনি বাঁটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হলো এন্ড বিএনপি-জামাতের বার্গেইনিং টুল বানানো হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কমিশন, ট্রাইবু৵নাল, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকে একটি আদর্শের লোকদের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণের বার্গেইনিং টুলে পরিণত করা হল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা জুলাইয়ে আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তাদের বাদ দিয়ে জিরো কন্ট্রিবিউশন গুপ্তদের ক্ষমতায়িত করা হলো।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি পোস্টে মাহফুজ আলম লিখেছেন, আমাদের এখনকার কাজ হলো—সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা। হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা। সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের উপর হামলার বিচার করার দাবি অব্যাহত রাখা।
জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিকে প্রধান করে তোলা এবং বিচারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে থাকা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করা। বাংলার বহু ভাষা-সংস্কৃতিকে যাপন-উদযাপন করা এবং রিগ্রেসিভ-ডিফিটিস্ট কালচারাল লড়াইকে জায়গা না দেওয়া।
কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা বিভিন্ন বর্গ থেকে জুলাইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাদেরকে ঔন করা। লীগের ফ্যাসিস্টদের লক্ষ্যবস্তু এরাই। যে যার জায়গা থেকে সক্ষম, যতবেশি সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলা।
জুলাইয়ের পক্ষের সকল শক্তির মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের একটা কমন স্পেইস/ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করা। অন্তর্ঘাতের ইতিহাস মাথায় রাখা। লীগের ধর্মতত্ত্ব ও বয়ানকে নর্মালাইজ করার বিরুদ্ধে জুলাই ও গত ১৬ বছরের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের বয়ানকে কেন্দ্রীয় করে তোলা। যারা গত দেড় বছরকে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের চাইতে খারাপ করে দেখাতে চেষ্টা করার মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অপকর্ম ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেসব লীগের ফ্যাসিস্টদের প্রতিহত করা।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশের কৃষক-শ্রমিক, নিম্ম-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জীবন-জীবিকার সঙ্কট দূরীকরণে সরকারকে বাধ্য করা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং সমন্বয়হীনতা এড়াতে দোষারোপের রাজনীতি বাদ দিয়ে সকল নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা চালুর পক্ষে লড়াই অব্যাহত রাখা।
জুলাইকে একটি মতাদর্শের ব্যানারে কুক্ষিগত ও বিভাজিত করার সকল প্রকল্পকে পরাস্ত করা।