বন্দরের সুবিধা, কাঁচামালের প্রাচুর্য ও রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে একসময় সমৃদ্ধ ছিল চট্টগ্রামের ট্যানারি-শিল্প। কিন্তু বিনিয়োগ সংকট, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়া এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় গত তিন দশকে প্রায় পুরো শিল্পই ভেঙে পড়েছে। গড়ে ওঠা ২২ ট্যানারির মধ্যে ২১টি বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবছরই চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের। বাধ্য হয়ে ঢাকামুখী হতে হয় তাঁদের। এ ছাড়া রয়েছে পুঁজির সংকট, কম দাম ও সংরক্ষণ ব্যয়ের চাপ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন ঈদুল আজহায় চট্টগ্রাম মহানগর এবং ১৫ উপজেলা মিলিয়ে সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চট্টগ্রামে বর্তমানে চালু আছে মাত্র একটি ট্যানারি—রিফ লেদার। ফলে সংগৃহীত অধিকাংশ চামড়া ঢাকার ট্যানারির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় আড়তদারদের বড় অংশকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ শেষে ঢাকায় পাঠাতে হয়।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে দীর্ঘদিনের কোটি কোটি টাকা বকেয়া আটকে থাকায় এবার কোরবানির আগে ভয়াবহ পুঁজির সংকট তৈরি হয়েছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘২০১৮ সালের পাওনা টাকাও এখনো পাইনি। চামড়া সংরক্ষণের খরচও অনেক বেড়ে গেছে। আমরা লোকসানের মুখে পড়ে যাচ্ছি।’ তিনি জানান, একসময় চট্টগ্রামে প্রায় আড়াইশ আড়তদার সক্রিয় থাকলেও এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩০ জনে। আতুরার ডিপো এলাকাতেও আগের তুলনায় ব্যবসায়ী কমে গেছে।
এদিকে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণের দাম বাড়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতিটি গরুর চামড়া সংরক্ষণে লবণ ও শ্রমিক ব্যয় মিলিয়ে গড়ে প্রায় ৪০০ টাকা খরচ হয়। এবার প্রতি কেজি লবণের দামও বেড়েছে। অথচ সরকারনির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে না। গত বছর সরকার প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে অনেক ক্ষেত্রে তা ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কোরবানিদাতারাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ‘সরকার বিনা মূল্যে লবণ বিতরণ এবং কিছু উদ্যোগের কথা বললেও বকেয়া পাওনা ও সিন্ডিকেটের জট কাটছে না। আমাদের দাবি, সরাসরি কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হোক।’
চট্টগ্রামের চামড়াশিল্পের অতীত ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। পাকিস্তান আমলে বহু শিল্পপতি এখানে ট্যানারি স্থাপন করেন। স্বাধীনতার পর দেশীয় উদ্যোক্তারাও নতুন নতুন ট্যানারি গড়ে তোলেন। ওরিয়েন্ট ট্যানারি, মেঘনা ট্যানারি, জুবিলি ট্যানারি, কর্ণফুলী লেদার, চিটাগাং লেদারসহ ২২টি ট্যানারি একসময় জমজমাট ব্যবসা করত। চট্টগ্রাম থেকে কোটি কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হতো। কিন্তু পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, সরকারি সহায়তার অভাব এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগের কারণে একে একে বন্ধ হয়ে যায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান।
আতুরার ডিপো এলাকার ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী বলেন, ‘শুধু কোরবানির সময়ই চট্টগ্রামে প্রায় ৫ লাখ গরু, মহিষ ও ছাগলের চামড়া পাওয়া যায়। সারা বছর মিলিয়ে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই কাঁচামাল দিয়ে অনায়াসে ৪০টি কারখানা চলতে পারে। অথচ এখন চলছে মাত্র একটি।’
রিফ লেদারের পরিচালক মুখলেছুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রামে ট্যানারি শিল্পের এখনো বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় বাজার বড় হয়েছে, বিদেশেও চাহিদা আছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ না থাকায় শিল্পটি পিছিয়ে পড়ছে। অতীতে অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স পূরণ করতে পারেনি, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও ছিল দুর্বল। ফলে একে একে ট্যানারিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার নীতিগত সহায়তা দিলে চট্টগ্রামে অন্তত ৩০-৪০টি ট্যানারি চালু রাখা সম্ভব।’
এর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে পশু মোটাতাজা করার প্রবণতা। প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেক্সামেথাসন, বেটামেথাসন ও পেরিঅ্যাকটিনের মতো নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহারে পশুর চামড়ার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, ‘স্টেরয়েড ব্যবহারে চামড়ায় অস্বাভাবিক ভাঁজ তৈরি হয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা কমে যাচ্ছে।’