২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার সাদিক খান আড়তের সামনে নাসির ও মুন্নাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় আসামি হন ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল। এ মামলার আরেক আসামি রায়েরবাজারের কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ইমন হোসেন। জোড়া খুনের বদলা হিসেবে এ বছরের ১২ এপ্রিল এই ইমন হোসেনকে হত্যা করা হয়।
রায়েরবাজারের এ জোড়া খুন ঘটনার মধ্য দিয়েই মূলত ফের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের খুনাখুনির ঘটনা শুরু হয়। এরপর একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২৮ এপ্রিল শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ খুনে জড়িত থাকতে পারেন এমন তিনজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম উঠে আসে। টিটনের পরিবারের অভিযোগ, খুনের সঙ্গে ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল জড়িত। আর পিচ্চি হেলাল বলছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন খুনের সঙ্গে জড়িত। অন্য একটি মহলের অভিযোগ, আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ জড়িত থাকতে পারেন এর পেছনে। কারণ তার বড় ভাই টিপু হত্যার আসামি ছিলেন টিটন। এমন সব পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নিয়েই পুলিশের তদন্ত চলছে। কিন্তু এখনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা এখনো বহাল। এ অবস্থায় সামনে চলে এসেছে একটি প্রশ্ন-সিরিজ খুনের খুনি কে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলোচিত এসব খুনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম উঠে এলেও তারা রয়েছেন বহাল তবিয়তে। এদের কেউ রয়েছেন দেশে, কেউ বিদেশে। আধিপত্য বিস্তারে খুন-পাল্টা খুনে জড়িয়ে পড়ছেন। বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করছেন। প্রাণভয়ে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলছেন না।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভঙ্গুর অবস্থার কারণে মূলত পেশাদার সন্ত্রাসীরা নানাভাবে সক্রিয় হতে শুরু করেন। ১১ আগস্ট মিরপুরের আব্বাস আলী (পুলিশের ভাষ্যে ‘কিলার আব্বাস’ হিসেবে পরিচিত), ১৩ আগস্ট তেজগাঁওয়ের শেখ মোহাম্মদ আসলাম, ১৫ আগস্ট হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন জামিনে মুক্ত পান। এর পরই বেরিয়ে আসেন মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন এবং খোরশেদ আলম রাসু। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হঠাৎ সক্রিয় হন সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ। ২০২৫ সালের ২৭ মে সেনাবাহিনী সুব্রত বাইন এবং মোল্লা মাসুদকে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে। এরা প্রত্যেকেই সরকারের পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম। জামিনে মুক্তি পাওয়া অধিকাংশই আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, জামিনে মুক্তি পেয়েই এরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠেন। হামলা-পাল্টা হামলা থেকে শুরু করে খুনাখুনিতে জড়িয়ে পড়ছেন। এ অপরাধীদের অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের দ্বন্দ্বের জায়গা হলো গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসা, নির্মীয়মাণ বাসাবাড়ি, ময়লা, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, যানবাহনের চাঁদা, কোরবানির পশুর হাট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ।
গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার পর তাঁকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার তেজগাঁওয়ের সড়কে যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় গুলি করে তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। ২৪ বছর কারাভোগের পর তখন কেবল তিনি বের হয়েছিলেন। সেদিন মামুন গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে ভুবনচন্দ্র শীল নামে একজন মোটরসাইকেল আরোহী সেদিন নিহত হন। ওই ঘটনায়ও নাম আসে ইমনের। গত বছরের ১৯ এপ্রিল হাতিরঝিলে যুবদল নেতা আরিফ সিকদারকে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের নাম আসে। গত বছরের ২০ মার্চ গুলশানে ইন্টারনেট ব্যবসায়ী সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর গত বছরের ২৫ মে বাড্ডার গুদারাঘাটে বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক সূত্র জানান, বাড্ডায় ক্যাব?ল টিভি, ইন্টারনেট ব্যবসা ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্বে খুনের ঘটনা দুটি ঘটে। এর মধ্যে মেহেদী গ্রুপের অনুসারী সুমন মিয়াকে গুলি করে হত্যা করেন রবীন, ডালিম ও মাহবুব গ্রুপের লোকেরা। এর প্রতিশোধ হিসেবে কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এসব খুনের কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও হত্যার পরিকল্পনাকারীরা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কারণে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড থামেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বাড়ছে। কিশোর গ্যাং আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। আতঙ্ক ছড়াচ্ছে জনমনে। পেশাদার সন্ত্রাসীর অনেককেই ব্যবসায়ীরা নীরবে চাঁদা দিচ্ছেন। সরাসরি অভিযোগ করলে হামলার ভয়, মামলা করলেও নিরাপত্তাহীনতা-এসব কারণে ভুক্তভোগীর অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। ফলে প্রকৃত সব ঘটনা পুলিশের রেকর্ডেও আসছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়েছেন। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তারা আবার অপরাধে জড়াচ্ছেন কি না, সেটি নজরদারির দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে মনে হয়, তাদের যথাযথভাবে নজরদারির মধ্যে রাখা যায়নি। তাই অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রশ্রয় না পান, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে শীর্ষ পর্যায়ের অপরাধীসহ সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিটি সরকারই সন্ত্রাসীদের তালিকা হচ্ছে বলে জানায়। কিন্তু এটি একটি তালিকা তালিকা খেলা। এসব কৌশল নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক একটি স্বস্তি হয়তো আসে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। বরং তালিকা ধরে ধরে আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশ প্রশাসন এও বলে থাকে, আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। হয়তো কিছু লোকজন তারা গ্রেপ্তার করে, কিন্তু তারা যাদের কথায় কাজ করছে তাদের গ্রেপ্তারের আওতায় আনতে হবে আগে। তবেই এ ভয়াবহতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।’