Image description
গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে বিদেশ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আর তাঁর এই সফরের গন্তব্যস্থল কোথায় হচ্ছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে নতুন দিল্লি ও বেইজিং—উভয় পক্ষেই কৌশলগত গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে।বাংলাদেশের একাধিক সূত্র ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভ-কে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরটি হবে এশিয়ার কোনো একটি দেশে। যার মধ্যে চীন ও ভারত—এই দুটি দেশকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই পছন্দের পেছনে বড় ধরনের তাৎপর্য রয়েছে; কারণ ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই উভয় দেশই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

সূত্রগুলো আরও জানায়, বেইজিং আগামী জুনের শেষভাগে তারেক রহমানের একটি দ্বিপাক্ষিক সফরের পরিকল্পনা করছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে সফরের ব্যাপারে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।কেন প্রথম সফরটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
যেকোনো নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফরের একটি বড় ধরনের প্রতীকী গুরুত্ব থাকে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের এই কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। ওই সময়ে ইউনূস অন্তত ১৩টি দেশ সফর করেছিলেন, যার মধ্যে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনই ছিল তাঁর প্রথম প্রধান গন্তব্য।

ভারত ও বাংলাদেশের তৎকালীন টানাপোড়েন সম্পর্কের কারণে ইউনূসের ভারত সফর কখনোই আলোচনার টেবিলে আসেনি। যদিও ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বাংলাদেশের জন্য এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, কারণ এর মাধ্যমেই বোঝা যাবে নতুন সরকার এই অঞ্চলের দুই প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখতে চায়।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফলের পর ভারত অত্যন্ত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথম সারির বিশ্বনেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, যিনি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তাতে এখন উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারত সফর করেন। নতুন দিল্লির পরিবেশকে তিনি ‘ঐকমত্যের আবহ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, উভয় পক্ষই "আলোচনা করতে, সম্পৃক্ত হতে এবং নতুন উদ্যোগ নিতে ইচ্ছুক।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বাস পুনর্গঠনের জন্য তাড়াহুড়ো না করে ধৈর্যের প্রয়োজন
 
অন্যদিকে, চীনও ঢাকার নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ জোরদার করেছে। গত এপ্রিলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর—যাঁকে সরকারের অন্যতম জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে বেইজিং সফর করেন। এর পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও চীন সফর করেন।অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং আঞ্চলিক সংযোগ (কানেক্টিভিটি) পরিকল্পনায় গভীর অংশীদারিত্বের কারণে চীন এখনো বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে রয়ে গেছে।
তিস্তা ফ্যাক্টর

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তা হলো ‘তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’।পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় বাংলাদেশ এই প্রকল্পে বেইজিংয়ের অংশগ্রহণ চেয়েছিল। এর আগে ভারতও তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশের সাথে অংশীদার হতে আগ্রহ দেখিয়েছিল, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতার কারণে বছরের পর বছর ধরে এর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় সেই রাজনৈতিক বাধাটির পরিবর্তন হয়েছে। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে চীনের কাছে এই প্রস্তাব দেওয়ায় বিষয়টিতে একটি নতুন কৌশলগত জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এনডিটিভির সঙ্গে আলাপকালে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ধারাবাহিকভাবে কেন্দ্রকে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করতে বাধা দিয়েছে। ২০১১ সালে যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশে ঐতিহাসিক সফর কর ছিলেন, তখন আমি বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর দায়িত্বে থাকা যৌথ সচিব ছিলাম।”

তিনি আরও যোগ করেন, “সেই সময় একেবারে শেষ মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তিতে অনুমোদন দিতে বা এর অংশ হতে অস্বীকৃতি জানান। মনে রাখতে হবে, ভারতের সংবিধানে পানি একটি যৌথ তালিকাভুক্ত বিষয় এবং এতে রাজ্য সরকারের সম্মতি থাকা আবশ্যক।”

শ্রিংলা বলেন, “যেকোনো পরিস্থিতিতেই চুক্তি বাস্তবায়নে রাজ্য সরকারকে সহযোগিতা করতে হয়। তিনি তখন সেটি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং এরপর থেকে সবসময়ই এই বিরোধিতা ধরে রেখেছেন। আর এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।”যদি তারেক রহমান চীন সফর করেন, তবে তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হবে, বিশেষ করে শিলি গুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে।

তবে চীন যদি প্রথম সফরের আতিথেয়তা পায়ও, ভারতের সফরটি তার থেকে খুব বেশি দূরে থাকবে না।গত এপ্রিলে এনডিটিভিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে সম্পর্কের এই ‘রিসেট’ বা নতুন শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেছিলেন যে, ঢাকা তার কূটনীতিকে কোনো দ্বিমুখী (বাইনারি) লেন্স দিয়ে দেখে না। চীনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতিকে কোনো "জিরো-সাম গেম" (একপক্ষের লাভ মানে অন্যপক্ষের ক্ষতি) হিসেবে দেখে না এবং তিনি আশা করেন অন্য দেশগুলোও বিষয়টিকে একইভাবে দেখবে।
তিনি বলেন, “অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো সমস্যা নয়।” বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি কৌশলগত অবস্থানের চেয়ে বাজার ব্যবস্থার ওপরই বেশি নির্ভরশীল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।