Image description

কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা রিপন হাওলাদার ও কলি বেগম দম্পতির বিয়ের ১০ বছর পর ঘর আলো করে জন্ম নেয় যমজ দুই কন্যা রাইসা ইসলাম ও রামিসা ইসলাম। এই শিশুদের বয়স ৫ মাস ২০ দিন। এর মধ্যে দেশজুড়ে শুরু হয় হামের প্রকোপ। রিপন বলেন, ‘সন্তানদের যেন হামের সংক্রমণ না হয় সেজন্য বাসার বাইরে কখনো বের করতাম না। কিন্তু বিপদ এড়ানো গেল না। গত শনিবার কিন্তু বিপদে পড়েছি আরেক মেয়ে রামিসাকে নিয়ে। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য এই সন্তানকেও হাসপাতালে রাখতে হচ্ছে। এত ছোট শিশুকে বাসায় কারও কাছে রেখে আসা সম্ভব না। আমরা ভীষণ ভয়ে আছি যেন এই সন্তানও আক্রান্ত না হয়।’ সরেজমিন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পাঁচ তলার হাম ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, মেঝেতে পাটি আর কাঁথা বিছিয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে বসে আছেন কলি বেগম। দুই সন্তানের মধ্যে এক মিনিটের বড় রাইসা। সারা শরীরে হামের লাল র‌্যাশ। হাতে লাগানো ক্যানুলা দিয়ে চলছে স্যালাইন। পাশে শুয়ে হাত-পা নাচিয়ে খেলছে আর নাম ধরে ডাকলে ফিক করে হাসছে রামিসা। কলি বেগম বলেন, ‘রাইসার বাবা কাপড়ে এমব্রয়ডারির নকশার কাজ করেন। এই আয়েই আমাদের সংসার চলে। হাসপাতাল থেকে স্যালাইন বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য ওষুধ আমাদের খাওয়া, যাতায়াত বাবদ অনেক খরচ হচ্ছে। তারপরও আশা যেন দুই সন্তানকে সুস্থভাবে বাড়ি নিয়ে যেতে পারি।’ দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। হামের প্রকোপে শিশুর মৃত্যু ৪৫০ ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৫৭ হাজারের বেশি শিশু। চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক পরিবার। কারণ হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়াসহ শিশুদের অন্যান্য জটিলতাও দেখা দিচ্ছে। এ কারণে চিকিৎসা খরচ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে কয়েকগুণ।

ভোলা জেলার বাপ্তা ইউনিয়নে রিকশাচালক মো. ইব্রাহিমের বসবাস। স্ত্রী নাসিমা বেগম, কন্যা নিপা (১০) আর ১০ মাসের সন্তান ফারাবিকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল দিন। কিন্তু বিপদ বাধে গত দুই মাস আগে ফারাবি নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে। মো. ইব্রাহিম বলেন, ছেলের ঠান্ডাজ্বর শুরু হলে ভোলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জানান ওর নিউমোনিয়া হয়েছে। এরপর ফারাবিকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে বাড়ি নিয়ে গেলে আবার তার সমস্যা দেখা দেয়। তখন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে এসে নিউমোনিয়ার রেশ না কাটতেই ছেলে হামে আক্রান্ত হয়। এরপর ফারাবিকে নিয়ে আমরা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আসি। এই হাসপাতালে ২০ দিন হলো আছি। নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হামের চিকিৎসাও চলছে। কিন্তু চিকিৎসা খরচ চালাতে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। দুই মাস ধরে কোনো আয় নেই। যেটুকু সঞ্চয় ছিল তা দিয়ে ছেলের চিকিৎসা করিয়েছি। কিছু হৃদয়বান মানুষ আমাদের সহযোগিতা করে গিয়েছিলেন। তা দিয়ে কয়েকদিন চলেছে। এখন খাবারের টাকা পর্যন্ত নাই।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও হামে আক্রান্ত শিশুর পেছনে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। রোগের জটিলতা বাড়লে সেই খরচ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে একজন হাম রোগীর পেছনে প্রতিদিন অন্তত ২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু যেসব শিশুর নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিচ্ছে তাদের খরচ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে কয়েকগুণ। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অনেককেই নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। গড়ে ১৫ দিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা খরচ মেটাতে অসহায় অবস্থায় পড়ছে পরিবারগুলো।

দেশে হামের উপসর্গে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু : দেশে হামের উপসর্গে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নিশ্চিত হামে কেউ মারা যায়নি। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) সন্দেহজনক হামে যে পাঁচ শিশু মারা গেছে তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের দুই, সিলেটের দুই এবং চট্টগ্রামের একজন। এ নিয়ে গত ৬৫ দিনে সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৩৮৯ এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৭৫ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামের রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ৪০৫ শিশু। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ১ হাজার ১৮৭। একই সময়ে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৮৯। গত ৬৫ দিনে সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৪ হাজার ৯১১ শিশু। তাদের মধ্যে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৪২ হাজার ৮৬৮। আর একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৮৫৬ শিশু।