যুক্তরাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন বিতর্ক। ‘চ্যানেল ফোর’-এর এই জনপ্রিয় শো-তে অংশ নেওয়া দুই কনে অভিযোগ করেছেন, অন-স্ক্রিন স্বামীদের দ্বারা তাঁরা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া তৃতীয় এক নারী তাঁর অন-স্ক্রিন সঙ্গীর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌন অসদাচরণের অভিযোগ এনেছেন। বিবিসির অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘প্যানোরামা’র কাছে নারীদের এই বিস্ফোরক জবানবন্দি প্রকাশের পর সোমবার (১৮ মে) বিকেলে ‘চ্যানেল ফোর’ কর্তৃপক্ষ তাদের সমস্ত স্ট্রিমিং এবং লিনিয়ার প্ল্যাটফর্ম থেকে এই অনুষ্ঠানের সব পর্ব ও সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট অপসারণ করতে বাধ্য হয়েছে।
‘ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ রিয়্যালিটি শো-তে মূলত হাজার হাজার অবিবাহিত তরুণ-তরুণী এই অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেন। পরে শো-এর সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা আবেদনকারীদের ব্যাকগ্রাউন্ড, ব্যক্তিত্ব, পছন্দ-অপছন্দ এবং মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো যাচাই করে একে অপরের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সঙ্গী বাছাই করেন। এভাবে এই শো-এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন নারী-পুরুষের জোড়া তৈরি করা হয়।
আইনগতভাবে এই বিয়েগুলো বৈধ নয়। এটি মূলত একটি প্রতীকী বা নকল বিয়ে। তবে তবে প্রতিযোগীরা এটিকে আসল বিয়ের মতোই গুরুত্ব দিয়ে খেলেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই তাঁদের একটি বিলাসবহুল জায়গায় হানিমুনে পাঠানো হয়। হানিমুন থেকে ফিরে এসে তাঁরা একটি নির্দিষ্ট অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে একসঙ্গে থাকা শুরু করেন। এই সময় তাঁদের বাইরের জগতের (যেমন-পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা মোবাইল ফোনের ব্যবহার) সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ক্যামেরার সামনে ২৪ ঘণ্টা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের ঝগড়া, ভালোবাসা ও মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ফুটিয়ে তোলা হয়।
এই শো নিয়ে প্রথম অভিযোগকারী হলেন লিজি (নিরাপত্তার স্বার্থে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে)। তিনি জানান, অনুষ্ঠানের ‘হানিমুন’ চলাকালীনই তাঁর অন-স্ক্রিন স্বামী হিংস্র আচরণ শুরু করেন। অফ-ক্যামেরায় তিনি লিজির ওপর অ্যাসিড হামলার হুমকিও দেন। লিজি অভিযোগ করেন, এক রাতে তাঁর অন-স্ক্রিন স্বামী বলেন, ‘তুমি না বলতে পারো না, তুমি আমার স্ত্রী’ এবং লিজি বারবার বাধা দেওয়ার পরও তাঁকে জোর করে ধর্ষণ করা হয়। লিজি ভয়ে জমে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন প্রোডাকশন টিমকে দেখান, যার ছবি প্যানোরামা যাচাই করেছে।
দ্বিতীয় ভুক্তভোগী ‘ক্লোই’ জানান, শো-এর সম্প্রচারের আগেই তিনি চ্যানেল ফোর এবং প্রযোজনা সংস্থা ‘সিপিএল’-কে তাঁর ধর্ষণের বিষয়টি জানিয়েছিলেন। ঘুমের মধ্যে তাঁর ওপর যৌন নিপীড়ন চালানো হয় এবং পরবর্তীতে সম্মতি না থাকার পরও অন-স্ক্রিন স্বামী তাঁর সঙ্গে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। ক্লোই জানান, বাধা দেওয়ার পর তাঁর সঙ্গী উল্টো রাগ করে বলেন, ‘তুমি আমাকে একজন ধর্ষকের মতো অনুভূতি দিচ্ছ।’ কিন্তু এই গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও ক্লোই-এর পর্বগুলো টেলিভিশনে প্রচার করে ‘চ্যানেল ফোর’। এটি পরবর্তীতে ক্লোইকে মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত করে যে তিনি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন।
অভিযোগকারী তৃতীয় নারী এই শো-এর ২০২৩ মৌসুমের প্রতিযোগী ও পারফর্মিং আর্টস শিক্ষিকা শুনা ম্যান্ডারসন। ক্যামেরার সামনে এসে তিনি জানান, তাঁর অন-স্ক্রিন স্বামী ব্র্যাডলি স্কেলি তাঁর সম্মতি ছাড়াই শারীরিক সম্পর্কের সময় চরম অসদাচরণ (গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারের চুক্তি ভঙ্গ) করেছিলেন। পরবর্তীতে শুনা গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং গর্ভপাত করাতে বাধ্য হন। ঘটনা জানার পর সিপিএল ও চ্যানেল ফোর অবশ্য এই জুটিকে শো থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।
অভিযোগের জবাবে প্রযোজনা সংস্থা ‘সিপিএল’-এর আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তাদের কল্যাণ ব্যবস্থা অত্যন্ত আন্তর্জাতিক মানের এবং তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাদের দাবি, লিজি ও ক্লোই শুরুতে এসব ঘটনাকে ‘পারস্পরিক সম্মতিমূলক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। অন্যদিকে, ধর্ষণে অভিযুক্ত দুজন পুরুষ এবং অপর অভিযুক্ত ব্র্যাডলি স্কেলি সমস্ত ধরনের যৌন অসদাচরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তবে চ্যানেল ফোরের বিদায়ী চিফ কনটেন্ট অফিসার ইয়ান কাটজ জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। ইতিমধ্যে চ্যানেল ফোর পুরো বিষয়টির একটি স্বাধীন পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে।
নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিখ্যাত সংগঠন ‘উইমেন্স এইড’ এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, ‘নারীদের প্রতি সহিংসতার কোনো বাছবিচার নেই। এমনকি কোটি মানুষের চোখের সামনে টেলিভিশনেও তা ঘটতে পারে।’
মিডিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেলেন উড মনে করেন, বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে অবাস্তব ও কৃত্রিম পরিবেশে প্রতিযোগীদের আটকে রাখার ফলেই এই ধরনের ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দশটি মৌসুম ধরে চলা এবং প্রায় ৩০ লাখ দর্শকের প্রিয় এই শো-টির ভবিষ্যৎ এখন চরম অন্ধকারে।