Image description

রীতিমতো চাপে আছেন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। আগস্ট মাসেই মূল্যায়ন করা হবে তাঁদের দাপ্তরিক পারফরম্যান্স। এর আগে সরকারের ছয় মাসের কর্মসূচি ঘোষণা করে এ সময়ের মধ্যে প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নের টার্গেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। স্থান বিশেষে অনেক সংসদ সদস্যকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ফলে তাঁদেরও দিন কাটাতে হচ্ছে ব্যস্ততার মাঝে। এদিকে দলীয় নির্বাচনি ইশতেহারকে সরকারি ইশতেহার হিসেবে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি অফিসেও প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিনের কাজের রিপোর্ট প্রতিদিন পর্যালোচনার সংস্কৃতি চালু করেছেন। সকালে সচিবালয়ে বা মন্ত্রসিভার বৈঠকে দেওয়া নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটুকু হলো তা সন্ধ্যা নাগাদ অথবা পরের দিন তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে অবহিত করতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই ‘জিরো টলারেন্স’ ও ‘কুইক রেসপন্স’ নীতিতে মন্ত্রিসভার অনেক সিনিয়র সদস্যও চাপের মুখে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।  

জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা অফিশিয়াল কর্মসম্পাদন করছেন প্রধানমন্ত্রী। মুখে কিছু না বললেও তাঁর কর্মগতির সঙ্গে তাল  মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। পাশাপাশি গলদঘর্ম হচ্ছেন সচিবালয়সহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সবাই সদা সতর্ক। অলসতা ত্যাগ করে সবাই এখন কাজকর্মে মনোনিবেশের চেষ্টা করছেন। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করছেন।  

জাতীয় সংসদের পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছেও এমপি-মন্ত্রীদের জবাবদিহির বিষয়ে সতর্ক নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, কাউকেই অন্যায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না। সরকারের পাশাপাশি তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কাছেও জবাবদিহি করতে হবে মন্ত্রী-এমপিদের প্রত্যেককে। এ ছাড়া প্রতি তিন মাস অন্তর সভার মধ্য দিয়ে মন্ত্রীদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব কার্যক্রম যেমন সামনে আনা হবে, তেমনি সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলোকেও দল ও নেতা-কর্মীদের সামনে তুলে ধরা হবে।

জানা গেছে, সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপে আছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সরকারকে একদিকে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি সামাল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে টার্গেট অনুযায়ী দলের দেওয়া রাজনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন। তা ছাড়া সামনেই নতুন বাজেট। দীর্ঘদিন পর জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচত দায়িত্ব নেওয়া একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য এ বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যরে ভিতরে বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবনিকাশ ও বিচার-বিশ্লেষণের মাধমেই তাঁকে প্রণয়ন করতে হচ্ছে এবারের জাতীয় বাজেট। বিশেষ করে সরকার প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও হিন্দু পুরোহিতসহ ধর্মীয় যাজকদের সম্মানি ভাতা, হেলথ কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন রকমের নতুন ও বাড়তি ব্যয়সমূহের বিষয়গুলো মাথায় রেখেই প্রণয়ন করতে হচ্ছে এই বাজেট। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরেই চাপে রয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। সারা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সিংহভাগ কাজই হয় এই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সামনে রেখে এ মন্ত্রণালয়কে হিমশিম খেতে হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণ। এরপর রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের সীমান্ত রক্ষা থেকে শুরু করে-অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ জননিরাপত্তার দায়িত্বও তাঁর মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যাস্ত। তারপরই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওপর সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি পূরণের দায়িত্ব পড়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি এবার জোরালোভাবে শুরু করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের টার্গেট দেওয়া হয়েছে এই মন্ত্রণালয়কে। এর মধ্যে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই কমপক্ষে ১ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়াও পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণেরও টার্গেট দেওয়া হয়েছে তাদের।

সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় চাপে আছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ও। দক্ষতার সঙ্গে জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টার পাশাপাশি দেশীয় খনিজসম্পদ উত্তোলনসহ বিদ্যুৎসংকট সমস্যার সমাধানেও গলদগর্ম হতে হচ্ছে এ মন্ত্রণালয়কে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের মতো স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ও মানুষের মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়। সাম্প্রতিক হাম সমস্যা নিয়ে চাপে আছে এই মন্ত্রণালয়। শেখ হাসিনার বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার এবং ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের সব অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও ব্যর্থতার দায় বহন করে জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করে তুলতে চাপে রয়েছে- সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।     

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কড়া নজরদারিতে রয়েছেন তাঁর সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিরা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেন তারেক রহমান। বলেছেন- অনিয়মের অভিযোগ পেলে যে যত বড় পদেই থাকুন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের বেলায় এ পদক্ষেপ আরও জোরালো হবে। তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে চায় সরকার।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নানা পদ্ধতি অবলম্বন করছেন সরকারপ্রধান তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ছাড়াও দুদককেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলের সিনিয়র নেতাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শুধু দুর্নীতিই নয় বরং যেকোনো পেশিশক্তি বা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও কঠোর। তাদের প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপে দেশে সুশাসন এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায় প্রতিদিনই সকাল ৯টার মধ্যে সচিবালয়ে প্রবেশ করছেন। তিনি সকালে চলে আসায় অন্যদের সবাইকে একই সময়ে, অনেক ক্ষেত্রে আগেভাগেই সচিবালয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে। কখন কোন মন্ত্রীকে তিনি ডেকে পাঠান সেটা বলা যায় না। অন্যদিকে- দেশের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় মন্ত্রী, এমপি ও আমলাদের প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ সফর না করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এখন চাইলেই কেউ বিদেশ ট্যুর করতে পারছেন না। প্রধানমন্ত্রী নিজেও অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর পরিহার করছেন এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে কৃচ্ছ্রসাধনে জোর দিচ্ছেন। সরকারি অর্থের অপচয় রোধে ইতোমধ্যে নিজের গাড়িবহরও কমিয়ে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী কাজে প্রধানমন্ত্রীর এই অভাবনীয় গতি এবং কড়া নজরদারির সঙ্গে মানিয়ে নিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন অনেক মন্ত্রী, এমপি ও সরকারি কর্মকর্তা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রধানমন্ত্রী যে কঠোর সময়সীমা (ডেটলাইন) বেঁধে দিচ্ছেন, তা পূরণ করতে সংশ্লিষ্টদের নাভিশ্বাস উঠছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ক্ষমতাসীন বিএনপি থেকে নির্বাচিত মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের এমপি ও দলের যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ বলেন, দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সব সময়ই আমাদের যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন। আবার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও মন্ত্রী-এমপিদের ত্রুটিবিচ্যুতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী আমাদের সব কাজ তদারকি করছেন। তিনি কাউকেই জবাবদিহির বাইরে রাখতে চান না। এজন্য ইতোমধ্যে আমরাও যেকোনো কাজের আগে সতর্কতা অবলম্বন করছি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘ঢিলেঢালা’ কাজের দিন শেষ করে রাষ্ট্রীয় কাজে গতিসঞ্চারে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ৮ মার্চ সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রী গুলশানের বাসভবন থেকে বের হওয়ার সময় উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মুচকি হেসে বলেন, ‘চলেন যুদ্ধে যাই।’ এই ছোট উক্তিতেই রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের ভাগ্য বদলে তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রামের দৃঢ় প্রত্যয় ফুটে ওঠে।