Image description

একসময় জুয়া মানে ছিল তাসের আড্ডা কিংবা গোপন আসর। এখন সেই জুয়া চলে স্মার্টফোনের পর্দায়। মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন আর বিকাশ-নগদের লেনদেনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর অনলাইন বেটিং সিন্ডিকেট। কিশোর থেকে বৃদ্ধ- সব বয়সি মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন এ ভয়ংকর নেশায়। বাদ থাকছে না স্কুলের শিক্ষার্থীরাও। এতে কেউ হারাচ্ছেন ব্যবসার মূলধন, কেউ বসতভিটা, কেউ সর্বস্ব হারিয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। অভিযোগ রয়েছে, অনলাইন জুয়া শুধু মানুষকেই সর্বস্বান্ত করছে না, এর মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জুয়ার কারণে আত্মহত্যা, খুন, চুরি, ছিনতাই, ঋণগ্রস্ততা ও পারিবারিক ভাঙনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালালেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকছে। ফুটপাতের দোকানি, সিএনজিচালক, নির্মাণশ্রমিক, কলেজ শিক্ষার্থী, গৃহপরিচারিকা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পর্যন্ত অনেকেই এখন নিয়মিত জড়াচ্ছেন বেটিং অ্যাপে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিকে৪৪৪, সিভি৬৬৬, নগদ৮৮, ক্রিক্রিয়া, ওয়ানএক্সবেট, বাবু৮৮, লাইনবেটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে চলছে জুয়ার আসর। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে সহজে টাকা জমা ও উত্তোলনের সুযোগ থাকায় দ্রুত বাড়ছে আসক্তি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাত্র একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যে কেউ জুয়ার জগতে প্রবেশ করতে পারছে। অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হওয়া কক্সবাজার শহরের এক তরুণ ব্যবসায়ী বলেন, আগে ডলার দিয়ে খেলতে হতো, তাই লোক কম ছিল। এখন বিকাশে টাকা পাঠালেই খেলা যায়। সহজ হওয়ার কারণেই লোভে পড়ে সবাই জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে এক সরকারি চাকরিজীবী এনজিও থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন। পুরো টাকাই জুয়ায় হারিয়ে পারিবারিক ও অর্থনৈতিক চাপে গত ১০ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করেন। এলাকায় কলেজছাত্র হৃদয় মিয়া বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেওয়া ২২ হাজার টাকা জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন। সেই টাকা ফেরত না পেয়ে ক্ষুব্ধ বন্ধুরা তাকে হত্যা করে। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর কক্সবাজার পৌরসভার এসএম পাড়ার ইমরান (২৮) অনলাইন জুয়ার ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। বগুড়ায় অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে খুন, আত্মহত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। যশোরেও জুয়া খেলতে গিয়ে ঋণের চাপে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, অনলাইন অপরাধ দমনে জেলার সব থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চান না।

স্থানীয়রা বলছেন, অনলাইন জুয়ার কারণে চুরি, ছিনতাই, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক কলহ বাড়ছে। অনেক তরুণ জুয়ার টাকা জোগাতে স্বর্ণালংকার বিক্রি, পরিবারের টাকা আত্মসাৎ এমনকি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে। একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলে। পরে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই বের হতে চাইলেও পারেন না। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনলাইন জুয়ার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী এজেন্ট সিন্ডিকেট। মাস্টার এজেন্ট, সাব-এজেন্ট ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পুরো নেটওয়ার্ক। খেলোয়াড় হারলে কমিশন পান এজেন্টরা। দেশের বিভিন্ন জেলায় বসে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করছে। 

এসব বিজ্ঞাপনে জনপ্রিয় সেলিব্রেটিদের এআই নির্মিত ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, অধিকাংশ বেটিং সার্ভার বিদেশে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সীমান্তবর্তী জেলা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশি এমন এলাকাগুলোতে এ নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয়। কক্সবাজার, মেহেরপুর ও যশোরে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার এজেন্টদের আটক করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার একই কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত কমরপুর গ্রামের নবাবকে একসময় গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি বিদেশে পাড়ি জমান। তার অনুপস্থিতিতে জুয়ার নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে আসেন মোরশেদুল আলম লিপু গাজী। তিনিও গত বছর অক্টোবরে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে একাধিক জেলায় অন্তত অর্ধডজন মামলা রয়েছে। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি জামিনে মুক্তি পান। অসুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুরে অনলাইন জুয়া মহামারিতে রূপ নিয়েছে। কয়েক শ তরুণ বিভিন্ন অ্যাপের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। মুজিবনগর উপজেলায় অনলাইন জুয়ার টাকায় অনেকের জীবনযাত্রায় হঠাৎ পরিবর্তন এসেছে। কেউ দোতলা বাড়ি করেছেন, কেউ বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন। অথচ তাদের দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয় নেই। 

মেহেরপুর পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে জুয়ার অ্যাপ শনাক্ত ও বন্ধ করার কাজ চলছে। তবে মূল হোতারা বিদেশে অবস্থান করায় তদন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভয়ংকর এই জুয়ার নেটওয়ার্কের বড় শক্তি হলো সহজ প্রযুক্তি ও মোবাইল ব্যাংকিং। বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে। একাধিক এমএফএস এজেন্ট জানিয়েছেন, অনেক গ্রাহক দিনে কয়েকবার বড় অঙ্কের টাকা ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট করছেন, যা অনলাইন জুয়ার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট বলে তাদের ধারণা। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। ২০২২ সালে রাশিয়া থেকে পরিচালিত একটি বেটিং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে কক্সবাজার থেকে ৯ ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দেশের আরও অনেক জেলায় জুয়ার এজেন্টদের গ্রেপ্তারের নজির আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, অ্যাপগুলো বিদেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস কর্মকর্তা শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, অনলাইন জুয়া, হুন্ডি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে তারা নিজেরাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালাচ্ছেন। 

সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে তারা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) প্রতিবেদন পাঠান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, যেখানে টাকার প্রবাহ বেশি সেখানেই অনলাইন জুয়ার রমরমা কারবার। মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের হাব হওয়ায় সেখানে অনলাইনের জুয়ার হাট বেশ চাঙা। আসক্ত হয়ে পড়েছেন ওখানকার শ্রমিকরা। পুলিশ ও সাইবার ইউনিট বলছে, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা বা ভয় থেকে অভিযোগ করতে চান না। ফলে মূল চক্র অনেক ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা নিয়ে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অনলাইন জুয়া দেশের জন্য বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিকসংকটে পরিণত হতে পারে।