ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বাসে সিনিয়র কর্তৃক জুনিয়রকে মারধরের ঘটনার জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাঝে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। রবিবার (১৭ মে) রাত সাড়ে আটটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস প্রধান ফটকে রাতের শিডিউল বাস ক্যাম্পাসে ঢুকলে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাঝে এ সংঘর্ষ সংঘটিত হয়।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি, ট্রেজারার, প্রক্টরিয়াল বডি সহ অন্য শিক্ষকেরা তাদের শান্ত করতে চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের সায়েন্স ভবনে এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মীর মশাররফ ভবনে আটকে রাখা হয়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিকেলে ৪টার ঝিনাইদহগামী মধুমতী বাসে যাওয়ার সময় তুচ্ছ ঘটনায় কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সিনিয়র কর্তৃক জুনিয়রকে মারধরের ঘটনা ঘটে। ঘটনার ভুক্তভোগী বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ বর্ষের শিক্ষার্থী অন্তর বিশ্বাস ও অভিযুক্ত লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৯-২০ বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয়। এরই জের ধরে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীরা মেইন গেইটে অবস্থান করছিলো, এবং পূনরায় তাদের মাঝে মারামারির সূত্রপাত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার বাস ক্যাম্পাসে ঢোকার পর লোকপ্রশাসন বিভাগের হৃদয়, জিহাদ এবং তাদের সঙ্গে থাকা কয়েকজন বাস থেকে নামতেই বায়োটেকনোলজি বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় যা এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষ শুরু হলে ১৯–২০ ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী হৃদয়কে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরে লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে এলে সংঘর্ষ বড় আকার ধারণ করে। এসময় উভয় বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। এ সময় প্রক্টরিয়াল বডি ও উপস্থিত শিক্ষার্থীরা দুপক্ষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেয়। এরপর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।
বায়োটেকনোলজি বিভাগের নাজমুল বলেন, আমাদের বিভাগের সাগরকে প্রথমে ঘুসি মারা হয়েছে। তামিম নামের যে ছেলেটা ওকে প্রথমে মেরেছে। সাগর আসলে আমাদের এবং জুনিয়রদেরকে আটকানোর চেষ্টা করছিল। সাগর যখন উত্তেজিত হয়েছে এরপর আবার ওকে মারছে। দুইজন আমাদের চোখের সামনে মার খেয়েছে। পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে এসে আমাদের মারধর করেছে। আমরা প্রক্টর স্যারের সাথে বসে ছিলাম। যারা মার খেয়েছে তারা হলো সাগর (২২-২৩ সেশন), নাফিস আরমান (২৪-২৫ সেশন), বাসে যে মার খাইছে সে হলো অন্তর বিশ্বাস।
ভুক্তভোগী বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সাগর বলেন, বাসের মধ্যে আমার বন্ধুর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনায় আমরা তারই প্রেক্ষিতে মেইনগেইটে অবস্থা করি কিন্তু আমাদের এমন কোন ইনটেনশন ছিলো না যে মারামারি করবো, কিন্তু আমার মনে হয় পাবলিক এ্যাডের ছেলে পূর্বপরিকল্পিত ভাবেই এক দুই কথায় আমাদের ওপর চড়াও হয় এবং গায়ে হাত তোলে, তাদেরকে বাঁধা দিতে গেলেই আমিও হামলার শিকার হই।
ঘটনার সূত্রপাত জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, বিকেল ৪ টার বাসে আমার বন্ধু যখন শহরে যাচ্ছিল, তখন ওই পাবলিক এ্যাডের ভাইর সাথে সামান্য বিষয়ে কথা কাটাকাটি এবং পরবর্তীতে তাকে মারধর করা হয়। আমরা এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেইনগেইটে অবস্থান করি কারণ প্রশাসন আমাদের আস্বস্ত করেছিল এর সুষ্ঠু বিচার হবে, কিন্তু মারামারির কোন উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না, কিন্তু আচমকাই তারা বাস থেকে নামা মাত্রই কথা-কাটাকাটি থেকে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় আমরা প্রায় ৫-৬ জনের মতো আহত হই।
লোকপ্রশাসন বিভাগের ১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের তামিম বলেন, কারা দাঁড়িয়েছিল এইটা আমি জানি না। আমি বাহির থেকে দেখলাম হঠাৎ করে ভিতরে শোরগোল চলছে। আমি ঢোকার পরে দেখি পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টের দুইটা ছাত্রের উপর হঠাৎ করে অতর্কিত হামলা হয়েছে। ওনারা দৌঁড় দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে গেছে। ওখানে কর্তৃপক্ষ সমাধান করার চেষ্টা করছে। বাকিটা প্রক্টর স্যার সমাধানের চেষ্টা করবেন।
নবনিযুক্ত উপাচার্য লোকপ্রশাসন বিভাগের হওয়ায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভিসি স্যার পুরো ক্যাম্পাসের অভিভাবক। সেখান থেকে তাকে কোনো স্পেসিফিক বিভাগের বলা যাবে না। আমরা এ ধরনের আচরণ করিনি। পরিস্থিতির কারণে যা হওয়ার হয়েছে, আমি সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি তবে আমার ওপরেও হামলা করা হয়েছে।
সিনিয়র অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, ছাত্রদের দুটি পক্ষ সামান্য একটি বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই উপাচার্যে নির্দেশে প্রক্টোরিয়াল বডিসহ আমি, প্রোভিসি ট্রেজারার তৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের সাথে কথা বলে চেষ্টা করেছি উত্তেজনার মাত্রা যেন বেড়ে না যায়। দুই বিভাগের সভাপতি তাদের ছাত্রদের নিয়ে বসেছেন। আশা করছি সামান্য ঘটনাটি এখানে শেষ হবে, আর দীর্ঘায়িত হবে না। ভাইস চ্যান্সেলর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী বলেন, ভাইস চ্যান্সেলর রাত ৮টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে কুষ্টিয়া গেছেন। আমরা ছাত্রদের দুই পক্ষের সাথে কথা বলে শান্ত করেছি। একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমাদের প্রক্টোরিয়াল বডি এবং বিভাগের দুই বিভাগের চেয়ারম্যানদ্বয় এসেছেন। প্রক্টর অফিসে দুই পক্ষকে নিয়ে বসার পর আশা করি তাদের মধ্যের ভুল বোঝাবুঝি সমাধান হবে। এই মুহূর্তে ক্যাম্পাসে কোনো প্রকার আইন-শৃঙ্খলার অবনতি বা কোনো রকম শঙ্কার কারণ নেই।