পাসপোর্ট অফিসের ঘুস ভাগাভাগিতে ‘শিয়ালের আলু ভাগের’ সেই গল্পের মতো এক বিশেষ পদ্ধতি দীর্ঘদিন চালু রয়েছে। দালাল-চ্যানেলে আসা ঘুসের টাকা দুভাগে ভাগ করা হয়। এর একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট অফিসপ্রধান নিজের কাছে রেখে দেন। বাকিটা অফিসের কেরানি থেকে শুরু করে নিরাপত্তা প্রহরী পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে নির্ধারিত হারে ভাগাভাগি করা হয়। ‘চ্যানেল মাস্টার’ বা ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে রীতিমতো খাতায় হিসাব কষে এমন ঘুস বাণিজ্য চলে।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জেরার মুখে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির এমন অভিনব পদ্ধতি ফাঁস করে দেন। দুদক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, পাসপোর্টের এমন ঘুস বাণিজ্য সহসা বন্ধ হওয়ার নয়। কারণ, ঘুসচক্রের সঙ্গে খোদ উচ্চপর্যায়ের কতিপয় কর্মকর্তা জড়িত। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের অসাধু সদস্য এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের পকেটেও যায় ঘুসের টাকা।
আবেদন যত, ঘুস তত : ঘুসের অঙ্ক নির্ধারিত হয় পাসপোর্ট আবেদনের সংখ্যার ওপর। অর্থাৎ যেসব অফিসে আবেদন বেশি, সেখানে ঘুসের অঙ্কও তত বড়। মোট আবেদনের অন্তত ৮০ শতাংশ আসে বিশেষ চ্যানেলে, অর্থাৎ দালালের মাধ্যমে। এসব আবেদনে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে ‘চ্যানেল খরচ’ হিসাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। আবেদনপ্রতি যার অঙ্ক দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা।
সূত্র জানায়, দালাল-চ্যানেলে আসা বিশেষ চিহ্নযুক্ত প্রতিটি আবেদন গুনে রাখা, ঘুসের টাকা সংগ্রহ এবং ভাগবাঁটোয়ারার জন্য প্রায় সব অফিসেই একজন কর্মচারী দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকেন। তাকে বলা হয় ‘চ্যানেল মাস্টার’। সাধারণত হিসাবরক্ষক বা ডিএডি (উপসহকারী পরিচালক) পদমর্যাদার কর্মচারীদের কেউ চ্যানেল মাস্টার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সারা দেশে প্রায় ৬৯টি অফিসে পাসপোর্ট আবেদন জমা নেওয়া হয়। দৈনিক আবেদন জমার ওপর ভিত্তি করে অফিসগুলো ‘এ, বি এবং সি’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০টি আবেদন জমা হলে সংশ্লিষ্ট অফিস ‘এ’ ক্যাটাগরি হিসাবে চিহ্নিত। এছাড়া কোথাও দুইশর নিচে আবেদন জমা হলে ‘বি’ এবং একশর নিচে হলে সেগুলোকে ‘সি’ ক্যাটাগরির অফিস বলা হয়।
সূত্র জানায়, মূলত পোস্টিং বাণিজ্যের জন্য সরকারি অফিসের এমন ক্যাটাগরি করা হয়। বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে-এমন অফিসগুলোয় পোস্টিং পেতে হলে মোটা অঙ্কের ঘুস দিতে হয়। পাসপোর্ট অধিদপ্তরে এমন ৩৩টি অফিস ‘এ’ ক্যাটাগরির বা ব্যাপক ঘুসপ্রবণ হিসাবে পরিচিত। এছাড়া ২৪টি অফিস ‘বি’ ক্যাটাগরি এবং বাকি ১২টি ‘সি’ ক্যাটাগরিভুক্ত।
চ্যানেল : পাসপোর্ট অফিসে ঘুসের হিসাব অনেকটা সরল অঙ্কের মতো। একেবারেই সহজ। আবেদনপ্রতি ন্যূনতম ঘুস দেড় হাজার টাকা। কোনো অফিসে দৈনিক একশ আবেদন জমা পড়লে এর ৮০ শতাংশ আসে দালাল চ্যানেলে। এতে গড়ে দৈনিক ঘুসের অঙ্ক দাঁড়ায় কমপক্ষে এক লাখ টাকা, যা সপ্তাহের ৫ কর্মদিবসে ৫ লাখ টাকা। মাসের হিসাবে ২০ লাখ টাকা। তবে এর বাইরে তথ্য সংশোধন এবং দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়াসহ নানা খাতে ঘুস বাণিজ্যের পথ খোলা।
সূত্র জানায়, ন্যূনতম ঘুসের এ হিসাব সবচেয়ে খারাপ পোস্টিং হিসাবে পরিচিত ‘সি’ ক্যাটাগরির অফিসে। দৈনিক এক হাজার থেকে দেড় হাজার আবেদন জমা হয়-এমন অফিসে পোস্টিং পেলেই মূলত পাসপোর্ট ঘুসের প্রকৃত স্বাদ মেলে। কারণ, এসব অফিসে ঘুসের টাকা আসে অনেকটা জোয়ারের পানির মতো। কোনো কোনো অফিসে সপ্তাহে ঘুসের অঙ্ক দাঁড়ায় ৪০ লাখ টাকারও বেশি। প্রতিমাসে দেড় কোটি টাকা। এসব অফিসকে বলা হয় ‘এ’ ক্যাটাগরির অফিস।
প্রধান কার্যালয়ে টাকাভর্তি প্যাকেট : এমন ঘুস বাণিজ্যের কথা পাসপোর্ট অধিদপ্তরে অনেকটা ওপেন সিক্রেট। এ কারণে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও খুশি রাখতে হয়। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পাসপোর্টের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিমাসেই নির্ধারিত তারিখে পাঠানো হয় টাকাভর্তি বিশেষ প্যাকেট বা ‘ঘুসের খাম’। গোপনে এসব প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হয় ক্ষমতাধর পরিচালক ও উপপরিচালকদের টেবিলে।
সম্প্রতি এক কর্মকর্তা প্রতিবেদকের কাছে ঘুসের টাকা ঘাটে ঘাটে কীভাবে ভাগবাঁটোয়ারা হয় তার অবিশ্বাস্য বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মিটিং বা অন্য কোনো অজুহাতে সশরীরে ঢাকার আগারগাঁওয়ে প্রধান কার্যালয়ে এসে টাকাভর্তি বিশেষ প্যাকেট পৌঁছে দেন। তবে অনেক সময় গোপনীতা রক্ষার জন্য কর্মকর্তাদের বাসায় গিয়ে প্যাকেট পৌঁছে দিতে হয়। এছাড়া ঘুসের টাকার ভাগ পান স্থানীয় কতিপয় রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনীর বেশকিছু অসাধু সদস্য এবং নামসর্বস্ব পত্রিকার সাংবাদিক নামধারী একশ্রেণির দালাল। যুগান্তরের কাছে ওই কর্মকর্তার এ সংক্রান্ত বক্তব্যের রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাসপোর্ট অফিসগুলোয় অন্তত ১০টি খাতে ঘুস বাণিজ্য চলে। এর মধ্যে আবেদন জমা, তথ্য সংশোধন, পূর্বনির্ধারিত সূচি ছাড়া আবেদন জমাসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে ঘুসের রেট বাঁধা। এর মধ্যে আবেদনপত্র জমার ক্ষেত্রে সাধারণত দেড় হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা ঘুস দিতে হয়। এছাড়া তথ্য সংশোধনে সমস্যাভেদে ঘুসের অঙ্ক নির্ধারিত হয়। সমস্যা যত বড়, ঘুসের অঙ্ক তত বেশি।
ডিজিএফআই-এর অভিযান : পাসপোর্টের এমন বেপরোয়া ঘুস বাণিজ্যের লাগাম টানতে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ২০১৯ সালে এক দুঃসাহসিক অভিযান চালায়। এ সময় অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাদের স্বীকারোক্তির অডিও এবং ভিডিও রেকর্ডসহ তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে সরাসরি তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ হিসাবে ২৫ কর্মকর্তার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়।
দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ধরে তদন্তের একপর্যায়ে তালিকায় থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে বাকিদের বিরুদ্ধে তদন্ত সেভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়নি। একপর্যায়ে তাদের কেউ কেউ প্রভাবশালীদের বিশেষ তদবিরে দুদক থেকে দায়মুক্তির সনদ পেয়ে যান। বর্তমানে তাদের অনেকেই ভোল পালটে ফের পুরোনো চেহারায় ফিরেছেন।
এর জ্বলন্ত উদাহরণ দিয়ে এক পাসপোর্ট কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ডিজিএফআই-এর শীর্ষ ২৫ দুর্নীতিবাজের তালিকায় উপপরিচালক বিপুল কুমার গোস্বামীর নাম আছে চার নম্বরে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ব্যাপক প্রভাবশালী ছিলেন। দীর্ঘ সময় প্রশাসন শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। পরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের তদবিরে দুদক থেকেও দায়মুক্তি পেতে সক্ষম হন। কিন্তু গত ১২ মে তাকে প্রাইজ পোস্টিং দিয়ে চট্টগ্রামের চাঁদগাঁওয়ে বদলি করা হয়েছে। চাঁদগাঁও অফিস পাসপোর্ট ঘুসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত।
মুখ খুলতে রাজি নন কেউ : পাসপোর্ট সেবায় ঘুস বাণিজ্য এবং ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল নুরুল আনোয়ারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হয়; কিন্তু তিনি তা ধরেননি। এমনকি বক্তব্য চেয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাসপোর্টের প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে মাঠ পর্যায়ের ঘুস বাণিজ্য এবং দুর্নীতির রেওয়াজ কিছুটা হলেও কম। নরসিংদী, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, মৌলভীবাজার, লক্ষ্মীপুর, টাঙ্গাইল, চাঁদপুর, যশোর, সাতক্ষীরাসহ আরও কয়েকটি অফিসে ঘুস চ্যানেল বহাল থাকলেও সেখানে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে। এছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান প্রশাসন শক্ত ব্যবস্থা নিলেও সেবার মান সেভাবে উন্নত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরং কড়াকড়ির কারণে কিছু জায়গায় ঘুসের সুযোগ কমে যাওয়ায় ভোগান্তি আরও বহুগুণ বেড়েছে। এর কারণ জানতে চাইলে তারা প্রতিবেদককে বলেন, ঘুস চ্যানেলে যত কড়াকড়ি করা হবে, সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি তত বাড়বে। তাদের মতে, গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢেলে কোনো লাভ হবে না। ঘুস চ্যানেল বন্ধ করতে হলে সবার আগে পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।