সকাল প্রায় সাড়ে ৮টা। ঢাকার এক ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেনের স্ত্রীর ফোনে হঠাৎ অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। ওপাশে কড়া গলায় একজন বলেন, আমি ডিবি থেকে বলছি। আপনার স্বামীকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। অবস্থা খুব খারাপ। বাঁচাতে চাইলে দ্রুত ব্যবস্থা নেন।
কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনের ওপাশে শোনা যায় কান্নাজড়িত কণ্ঠ। ‘আমারে বাঁচাও... ওরা খুব মারতেছে...’ কণ্ঠটি ছিল ওই নারীর স্বামীর মতোই। আতঙ্কে ভেঙে পড়েন তিনি। এরপর আবার ফোন দেন কথিত ‘ডিবি কর্মকর্তা’। বলা হয়, ১০ লাখ টাকা দিলে ‘ম্যানেজ’ করে ছেড়ে দেওয়া হবে। না হলে কয়েকদিনের মধ্যেই ‘অবস্থা খারাপ’ হয়ে যাবে। সেটি আবার নির্দিষ্ট একটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠাতে হবে বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের বলা হয়, টাকা পাঠানোর পর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের একটি গেট কিংবা কারাগারের নির্দিষ্ট গেটের সামনে অপেক্ষা করতে। সেখানে কিছুক্ষণের মধ্যেই আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হবে। ভয়ে-আতঙ্কে পরিবার টাকা জোগাড় করে কুরিয়ারও করে। এরপর নির্ধারিত স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন তারা। কিন্তু আসামি আর আসে না। কিছু সময় পর প্রতারকদের মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তারা বুঝতে পারেন, পুরো ঘটনাই ছিল সংঘবদ্ধ প্রতারণা।
ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেনের স্ত্রী মারযুকা জাহান যুগান্তরকে বলেন, এমন প্রতারণার শিকার হয়েছি যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। মামলা করেছি, ডিবি পুলিশ সেটা তদন্ত করছে। এ বিষয় নিয়ে আর কথা বলার শক্তি নেই।
এমন কয়েকটি ঘটনার তথ্য যুগান্তরের হাতে এসেছে। এসব ঘটনায় থানায় মামলাও করা হয়েছে।
গাজীপুরের সাবেক কাউন্সিলর কাজী আবু বকর সিদ্দিকের পরিবারও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়। তার স্ত্রী পাপিয়া সুলতানা অভিযোগ করে বলেন, ৩ মার্চ সকালে তার ছেলে পিয়াসের মোবাইলে ফোন করে একজন নিজেকে র্যাব-১-এর কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম পরিচয় দেন। তিনি বলেন, কাশিমপুর কারাগারে থাকা কাজী আবু বকর সিদ্দিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উত্তরা র্যাব হেডকোয়ার্টার্সে আনা হয়েছে।
পরে পাপিয়া সুলতানা ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে ফোনে এমন একজনের সঙ্গে কথা বলানো হয়, যার কণ্ঠস্বর তার স্বামীর মতো ছিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ওই ব্যক্তি বলেন, ৫ লাখ টাকা দিয়ে দাও, আমাকে বাঁচাও। টাকা দিলে ওরা ছেড়ে দেবে। এরপর কথিত র্যাব কর্মকর্তা বারবার ফোন করে টাকা পাঠাতে চাপ দিতে থাকেন। ভয়ে পরিবার ৫ লাখ টাকা জোগাড় করে। প্রথমে তাদের উত্তরায় যেতে বলা হলেও পরে এসএ পরিবহণের তাঁতীবাজার শাখায় টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা কুরিয়ারে টাকা পাঠানোর কিছু সময় পর আরও ৩ লাখ টাকা দাবি করে প্রতারক চক্র। এতে তাদের সন্দেহ হলে পাপিয়া সুলতানা, তার ছেলে ও স্বজনরা এসএ পরিবহণের তাঁতীবাজার শাখায় গিয়ে খোঁজ নেন। সেখানে তারা জানতে পারেন, এরই মধ্যে প্রতারকরা পাঠানো ৫ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। পরে কুরিয়ার কর্তৃপক্ষের সহায়তায় একই নম্বরে আবার যোগাযোগ করা হয়। বলা হয়, আরও ৩ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে, এসে নিয়ে যেতে হবে। সন্ধ্যায় টাকা নিতে এলে ভুয়া র্যাব পরিচয়ধারী এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে তিনি নিজের নাম জাবেদ হোসেন বলে পরিচয় দেন। পরে মামলা করা হয়।
যুগান্তর খোঁজ নিয়ে জানতে পারে-র্যাব-১-এর কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি ও বিল্লাল হোসেনের স্ত্রীকে ডিবির কর্মকর্তা সেজে ফোন দেওয়া একই ব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে মোট ৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা আদালতে বিচারাধীন বাকি তিনটি মামলা তদন্তাধীন। সব মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে অপরাধের ধরন একই। কারাগারে থাকা আসামির স্বজনরাই এই চক্রের টার্গেট। মামলাগুলোর মধ্যে একটি মামলার তদন্ত করছেন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের এসআই পরিমল চন্দ্র দাস। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে প্রতারণা করে আসছে। আদালতে আসা ব্যক্তিদের গাড়ির ড্যাশবোর্ডে থাকা নম্বর সংগ্রহ করে প্রথমে চালককে ফোন দেওয়া হতো। পরে পরিবারের সদস্যদের জানানো হতো, আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বা নির্যাতন করা হচ্ছে। ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, এমনকি এক কারারক্ষীর স্ত্রীকেও ফোন দিয়ে চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে ৮৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এসআই পরিমল বলেন, অভিযুক্ত অত্যন্ত চতুর। কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, আবার কখনো ভুক্তভোগী সেজে কথা বলত। এর আগেও গাজীপুরে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির মামলায় তাকে শনাক্ত করা হয়েছিল। প্রযুক্তির সহায়তায় আবার গ্রেফতার করা হয়। পরে জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজ করেন। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত আগে বিমানবন্দর এলাকায় চাকরি করতেন। চাকরি হারানোর পর প্রতারণাকে পেশা হিসাবে বেছে নেয়। জুয়া ও অর্থ সংকটের কারণে সে এসব অপরাধে জড়ায়। তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও মানি লন্ডারিং মামলা রয়েছে ও বিভিন্ন মামলায় জামিন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া একটি নির্দিষ্ট আইনজীবীর মাধ্যমে বারবার জামিন নেওয়ার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসামির পরিবারের মোবাইল নম্বর বা মামলার বিস্তারিত তথ্য বাইরের কারও সহজে জানার কথা নয়। কিন্তু চক্রটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আসামির নাম, মামলার ধরন, আদালতে তোলার সময়, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কও জেনে যাচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, আদালত কিংবা কারাগারে আসামির সঙ্গে দেখা করতে গেলে কৌশলে পরিবারের সদস্যদের নম্বর সংগ্রহ করা হয়। কারাগারের ভেতরে থাকা চক্রের সদস্যরা কখনো সহানুভূতির ভান করে, কখনো বিভিন্ন কাগজপত্র পূরণের কথা বলে মোবাইল নম্বর নেয়। পরে সেই নম্বর বাইরে থাকা সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। এছাড়া আদালতপাড়ার কিছু অসাধু দালাল ও সহযোগীর মাধ্যমে আসামির মামলার তথ্য, ঠিকানা ও আর্থিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে কারাগার, আদালতের হাজতখানা কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।