Image description

দুপুর ১টা। ছোট আয়াতকে কোলে নিয়ে টিসিবি’র ট্রাকের পেছনে ছোটাছুটি করছিলেন মা রাবেয়া আক্তার। প্রচণ্ড গরমে শিশুটি কান্না শুরু করলে বাবা সিফাত হাতের ব্যাগ দিয়ে বাতাস করার চেষ্টা করেন। এরপর ছুটে যান পাশের চায়ের দোকানে পানি কিনতে। মা রাবেয়া লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন পণ্য পাওয়ার আশায়। গতকাল এই দৃশ্য দেখা যায়- মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে টিসিবি’র ট্রাকের লাইনে। লাইনে শুধু এই দম্পতি নয় নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকায় লাইনে এসে ভিড় করেছেন মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীরাও।

সিফাত জানান, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মাসের বেতন বাসাভাড়া ও বাজার খরচেই শেষ হয়ে যায়। বাসায় কেউ নেই শিশু সন্তানকে দেখাশোনা করার মতো। তাই বাধ্য হয়েই তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। এখানে দুই লিটার সয়াবিন তেল ২৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, যা বাজারে প্রায় ৩৮০ থেকে ৩৯০ টাকা। কিছু টাকা সাশ্রয় হবে বলেই লাইনে দাঁড়িয়েছি।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে টিসিবি সারা দেশে ৭২০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে ভোজ্য তেল, চিনি ও মসুর ডাল বিক্রি করছে। ১১ই মে থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম চলবে ২১শে মে পর্যন্ত। বর্তমানে টিসিবি’র ট্রাক থেকে একজন ব্যক্তি এক কেজি চিনি, দুই কেজি মসুর ডাল ও দুই লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেল কিনতে পারেন। প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা, মসুর ডাল ৭০ টাকা ও দুই লিটার সয়াবিন তেল ২৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তিনটি পণ্যের এই প্যাকেজ কিনতে ৪৮০ টাকা লাগে। টিসিবি’র তথ্য অনুযায়ী, খুচরা বাজারে দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল এখন ৩৯০ টাকা। এ ছাড়া মোটা দানার মসুর ডাল প্রতি কেজি ৯০-১১৫ টাকা, আর প্রতি কেজি চিনি ১০৫-১১০ টাকায় বিক্রি হয়। সীমিত আয়ের মানুষ টিসিবি’র ট্রাক সেল থেকে এ তিনটি পণ্য বাজারমূল্যের চেয়ে ২০০ টাকা কমে কিনতে পারছেন।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, টিসিবি’র সারিতে নিম্ন আয়ের মানুষদের দাঁড়ানোর কথা থাকলেও দেখা গেছে, এই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাও।

টিসিবি’র ট্রাকে ২৫০ জন মানুষের পণ্য থাকে সাধারণত। তাদের মধ্যে একেকজন একেক পেশার। তীব্র ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি করে কোনোভবে টাকা দিয়ে কিনে নিচ্ছিলেন কাঙ্ক্ষিত পণ্য। এসময় বিভ্রান্তিতে পড়ে যান ট্রাকে থাকা বিক্রেতারাও। অনেককে আবার তিনবারও পণ্য কিনতে দেখা গেছে। শেষ মুহূর্তে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন ট্রাকের ওপর, পরিস্থিতি সামলাতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে বিক্রেতাকে।

দুপুর আড়াইটা, সেগুনবাগিচায় টিসিবি’র ট্রাকের পণ্য প্রায় শেষের দিকে। এমন মুহূর্তে দুই হাত উঁচু করে বারবার বিক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছিলেন ৭২ বছর বয়সী করিম। ২০ মিনিট হুড়োহুড়ি করে টিসিবি’র পণ্য পেয়েছেন তিনি। করিম বলেন, আমার এক ছেলে ছোট চাকরি করে। আমিও অসুস্থ বয়স হয়ে গেছে সংসার চালাতে খুব হিমশিম হয় ছেলের। এখান থেকে পণ্য কিনলে কিছু টাকা সাশ্রয় হবে। তাই ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়েছিলাম। বর্তমানে বাজারের যে ঊর্ধ্বগতি ঈদ আসলে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়।

বেসরকারি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ছোট চাকরি করি। মাসে বেতন পাই ২২ হাজার টাকা। এ টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। বাজার করতেই অর্ধেক টাকা শেষ হয়ে যায়, বাকি বাসাভাড়া, গাড়ি ভাড়া তো আছেই। যদি টিসিবি পণ্য পাই তাহলে সাশ্রয় হওয়া টাকা দিয়ে সংসারের অন্য কিছু কিনতে পারবো।

শাহবাগে দু’বার টিসিবি’র পণ্যের জন্য লাইনে দাঁড়ালে অন্য নারীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় সেলিনা আক্তারের। সবাই অভিযোগ করছিলেন- তিনি তৃতীয়বার এসেছেন পণ্য নিতে। সেলিনা বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ। একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে। আজ দু’দিন ধরে কাজ করতে পারছে না। আমি বাধ্য হয়ে এসেছি এখানে, দুবার নিয়েছি; কারণ এখানে কম টাকায় পণ্য পাওয়া যায়। বাজার থেকে কিনলে আরও বেশি টাকা লাগবে। যদি আমার স্বামীর ভালো আয় হতো তাহলে এখানে আসতাম না।

এখানেই লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন পাঠাও রাইডার মামুন হোসেন। তিনি বলেন, অনেকক্ষণ ধরে যাত্রী পাচ্ছিলাম না। পথে দেখি টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করছে তাই লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছি। ২৬০ টাকায় দুই লিটার তেল পাচ্ছি অথচ এই তেল বাজারে বিক্রি হয় ৩৯০ টাকায়। এখান থেকে পণ্য কিনলে ২০০ টাকার মতো সাশ্রয় হয়; তাই লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছি। সাশ্রয় হওয়া টাকা দিয়ে সংসারের জন্য অন্য কিছু কিনতে পারবো।