Image description

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প্রকাশ্যে নাছির (৬০) নামে এক ডিশ ও ক্যাবল ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করেছে পুলিশ। ঘটনার পর সিসি ক্যামেরার একটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে, তা বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে সড়ক দিয়ে রক্তমাখা ছুরি হাতে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া দুই ব্যক্তি হলো কুখ্যাত সন্ত্রাসী শরীফ ও তার সহযোগী জুয়েল।

এদিকে ডিশ ব্যবসার অংশীদার আব্দুস সালাম বাবুর সঙ্গে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সুপরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন নিহতের স্ত্রী। এই ঘটনায় মূল আসামির চার ভাইকে ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। 

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে নৃশংস হামলা 

গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দুপুরে ফতুল্লার চানমারী মাউড়াপট্টি এলাকায় ‘ফ্রেন্ডস ক্যাবল’ নামে একটি ডিস ও ক্যাবল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত নাছির ওই এলাকার মৃত সাইজ উদ্দিনের ছেলে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো ঘটনার সময় নাছির তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একা অবস্থান করছিলেন। দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে হঠাৎ তার চিৎকার শুনে আশেপাশের লোকজন ছুটে গিয়ে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে শহরের ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কালো হাতলযুক্ত একটি রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করেছে। নিহতের শরীরে তিনটি গভীর ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। 

কিলার শরীফ ও জুয়েলের সিসিটিভি ক্লু

ঘটনার সময় উপস্থিত আলাউদ্দিন নামে এক অটো রিকশা চালক বলেন, “আমি সড়কে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এসময় ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরি হাতে কালো পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তিকে দৌড়ে মাইক্রোস্ট্যান্ডের দিকে চলে যেতে দেখেছি।” 

পরবর্তীকালে আশেপাশের সড়কের একটি সিসিটিভি ফুটেজ ফেসবুকে ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, কালো পোশাক পরা এক ব্যক্তি এবং তার সঙ্গে গেঞ্জি পরিহিত এক যুবক দ্রুত দৌড়ে পালাচ্ছেন। স্থানীয়দের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, কালো জামা পরা ওই ব্যক্তির নাম শরীফ এবং তার সহযোগী জুয়েল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালে চাঞ্চল্যকর মানিক ওরফে কালা মানিক (৩০) হত্যা মামলার প্রধান আসামি এই শরীফ। ওই ঘটনার পর ঢাকা থেকে র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগের পর বছরখানেক আগে সে জামিনে বের হয়। শরীফের বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। 

ব্যবসায়িক বিরোধের অভিযোগ ও ৪ জন আটক 

নিহত ব্যবসায়ী নাছিরের স্ত্রী সায়মা বেগম দাবি করেন, তার স্বামীর সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদার আব্দুস সালাম বাবুর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এর জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে তার স্বামীকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় তারা ফতুল্লা থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর যৌথ তৎপরতায় অভিযুক্ত শরীফের চার ভাইকে আটক করা হয়েছে। সজিব ও শান্তকে (শরীফের ভাই) ঘটনার পর পুলিশি অভিযানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। আরিফ ও নাঈমকে (শরীফের অন্য দুই ভাই) রাতে চানমারী এলাকার একটি বাড়ি ঘেরাও করে এলাকাবাসী এই দুজনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।

পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য 

ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুব আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে যে দুজনকে দৌড়ে পালাতে দেখা গেছে, প্রাথমিকভাবে তারা শরীফ ও জুয়েল বলে শনাক্ত হয়েছে এবং তারাই এই খুনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এছাড়া মূল অভিযুক্ত শরীফের চার ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। ডিশ ব্যবসার অংশীদার বাবুর সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি আমরা মাথায় রেখে কাজ করছি, তবে এখন পর্যন্ত তদন্তে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি।” 

এদিকে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর। পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পুরো বিষয়টি তদন্ত করছে। আশা করি খুব দ্রুতই মূল আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।”