মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) আইনের অপব্যবহারের শিকার হয়েছে চাঁদপুরের শাহরাস্তির চিতোষী গ্রামের একটি পরিবার। ৪ মে সন্ধ্যায় গ্রামটির এক স্কুলছাত্রী ও তার মা ইভটিজিং এবং শ্লীলতাহানির শিকার হন। ওইদিন সন্ধ্যায় চার বখাটেকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে পরিবারটি ও তাদের আশপাশের লোকজন। এরপর বখাটেদের এক রাত থানায় রেখে পরের দিন বিচারের জন্য পাঠানো হয় শাহরাস্তির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে। ইউএনও চার বখাটেকে দুই লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে সাত দিনের কারাদণ্ড দেন।
পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে মেয়েটিকে আর উত্ত্যক্ত করা হবে না এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করবেন মর্মে স্ট্যাম্পের ওপর লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়। অঙ্গীকার নেওয়ার পরদিনই ভুক্তভোগী পরিবারটির বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। হুমকি দেওয়া হয় মেয়েটিকে ধর্ষণের। এর পর থেকে ভুক্তভোগী মেয়ে ও তার মাসহ পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মেয়েটি চিতোষী আর অ্যান্ড এম উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। আর বখাটেরা এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে পরিচিত।
এদিকে মোবাইল কোর্ট আইনের অপব্যবহারের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন শাহরাস্তির ইউএনও নাজিয়া হোসেন ও ওসি মীর মাহবুবুর রহমান। এ ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে ৬ মে চাঁদপুরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তলব করা হয় ওসি মাহবুবুর রহমানকে। সে অনুযায়ী ১২ মে ওসি সশরীরে হাজির হন। সেখানেও মোবাইল কোর্টের অপব্যবহারের তথ্য গোপন করতে ওসি মিথ্যা বক্তব্য দাখিল করেন।
ওসি এবং ইউএনও দাবি করেছেন, ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার, বখাটে রাকিবের বাবা রফিকুল ইসলাম, যে দোকানে বখাটেদের আটকে রাখা হয়েছিল, সেই দোকানের মালিক রাফসানসহ স্থানীয় অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক।
তারা সবাই বলেছেন, ঘটনার দিন অর্থাৎ ৪ মে সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী পরিবার ও তাদের আশপাশের লোকজন পাঁচ বখাটেকে ধরে নিয়ে বাড়িটির পাশেই চিতোষী বাজারে রাফসানের দোকানে আটকে রাখে। পাঁচজন হলেন—পার্শ্ববর্তী কসবা গ্রামের মো. রাকিবুল হাসান (১৮), তানজিল ছিদ্দিকি সৌরভ (১৮), আহসিম বিল্লা তানি (১৮), রায়েরবাগ গ্রামের আশ্রাফুল করিম (১৮) এবং তেতৈশ্বর গ্রামের মাহফুজ আলম। পরে স্থানীয় নেতাকর্মীরা মাহফুজ আলমকে ছিনিয়ে নেয়। আর উঘারিয়া ফাঁড়ির দুজন পুলিশ এসে বাকি চার বখাটেকে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে থানায় নিয়ে যায়। সেদিন রাতে অভিযুক্তদের পরিবারের লোকজন, ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ থানাতেই ছিলেন। পরের দিন ৫ মে সকালে চার বখাটেকে ইউএনওর অফিসে নিয়ে গেলে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে বিচার করে জরিমানা করা হয়। তেতৈশ্বর গ্রামের মো. মনির হেসেনের ছেলে মাহফুজ আলম ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ায় তার পিতার কাছ থেকে মুচলেকা নেয় প্রশাসন।
৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে মনির হোসেনের দেওয়া মুচলেকায় বলা হয়, ‘ওই ঘটনায় অপরাধ স্বীকার করছি। ভবিষ্যতে আমার ছেলে কর্তৃক কোনোভাবে মেয়েটি (নাম গোপন রাখা হলো), কোনো প্রকার উত্ত্যক্ত না করা এবং যেন নিরাপত্তাহীনতায় না ভুগে সে বিষয়টি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করছি। এতে আরও বলা হয়, অদ্য (৪ মে) সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে মেয়েটিকে, চিতোষী তালুকদার বাড়িতে মাহফুজ আলম, পিতা—মনির হোসেন কর্তৃক শ্লীলতাহানির শিকার হয়। মাহফুজ ভিকটিমের বাড়িতে গিয়ে তাকে অশ্লীলভাবে কথা বলে ও আক্রমণের চেষ্টা করে। যা দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৫০৯ ধারা মোতাবেক দণ্ডনীয় অপরাধ।
মোবাইল কোর্ট আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (নির্বাহী হাকিম) বা ধারা ১১-এর অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা হাকিম) আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করার সময় তপশিলে বর্ণিত আইনের অধীন কোনো অপরাধ; যা কেবল জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য, তার সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হয়ে থাকলে তিনি ওই অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে গ্রহণ করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে, স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে, দোষী সাব্যস্ত করে, এই আইনের নির্ধারিত দণ্ড আরোপ করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনের বিধান এমন থাকলেও শাহরাস্তির ইউএনও তা লঙ্ঘন করেছেন। তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে ইউএনওর কাছে সোপর্দ করেছে। এর পর মোবাইল কোর্ট বসিয়ে চার বখাটেকে জরিমানা করেছেন। এ ছাড়া বখাটেদের অভিভাবকদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকারনামায় ইউএনও স্বাক্ষর করেছেন, সেখানেও শ্লীলতাহানির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এই শ্লীলতাহানির বিচার মোবাইল কোর্ট করতে পারেন না। আইনের তপশিলে এই বিষয়টি বিচারের এখতিয়ার নির্বাহী হাকিমদের দেওয়া হয়নি। এটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিচার্য একটি বিষয়।
ওই আইনের ১০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে তার যৌনকামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তাহার শরীরের যে কোন অঙ্গ বা কোন বস্তু দ্বারা কোন নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোন অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোন নারীর শ্লীলতাহানি করেন তাহলে তার এই কাজ হবে যৌনপীড়ন এবং এজন্য উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বছর কিন্তু অন্যূন তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।’
অন্যদিকে ওসি আইন অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মিত আদালতে বিচার্য একটি বিষয়কে তিনি ঘটনার এক দিন পর মোবাইল কোর্টের কাছে পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ ছিল বলে জানা গেছে। আর এর খেসারত গুনছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।
জানতে চাওয়া হলে ভিকটিমের বাবা কালবেলাকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (৪ মে) ঘরে বসা। সন্ধ্যার দিকে পোলাপান সোজা বাড়িতে ঢুকে আমার নাম ধরে চিৎকার করে। বাড়িতে একটা মিছিলের মতো শুরু হয়ে যায়। এর পর আমি আর আমার স্ত্রী বের হই। বাড়ির অন্যরাও বের হন। তখন আমরা সাতজনের মধ্যে পাঁচজনকে ধরে ফেলি। ধরার পর উচ্ছৃঙ্খল জনতা যখন মারার জন্য আসে, তখন আমি নিষেধ করি। আমি পুলিশরে ফোন দিই। ফোন দেওয়ার পর দেখি উনারা আইতে আইতে আধাঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে। তখন আমরা তাদের বাজারে আনছি। একটা দোকানে রাখছি। এরপর ফাঁড়ির পুলিশ আইছে। তখন স্থানীয় নেতাকর্মীরা বসে সমঝোতা করার কথা বলে। আমি তখন বলছি, আমার ইজ্জত গেল, মেয়ের ইজ্জত গেল, বউয়ের শীল্লতাহানি করল, বাজারের হাজার হাজার পাবলিক জেনে গেল। আমি তাদের চালান চাই, মামলা করতে চাই। তখন পুলিশ তাদের থানায় নিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, থানায় সারা রাত আমাদের রাখছে। আসামিদেরও রাখছে। এলাকার নেতাকর্মীরা ছিল। এরপর সেদিন রাত ৪টার দিকে মামলা লিখছে। লেখার পর জিজ্ঞেস করেছিলাম, আসামিদের চালান কখন দেবেন। তখন পুলিশ জানায়, সকাল ১০টার দিকে। আমার মেয়েকে আনতে বলে জবানবন্দি নেওয়ার জন্য। এর পর সকাল ৯টার দিকে আমার মেয়ের জবানবন্দি নেয়। পরে সেখান থেকে বের হয়ে আমরা নাশতা করতে আসছি। তখন ফাঁড়ির এসআই শফিক স্যার বলছেন, আসামিদের তো চাঁদপুর নেওয়া হচ্ছে না। টিএনও ম্যাডামের কাছে যাবে। টিএনও ম্যাডাম বিচার করবেন। এরপর টিএনও ম্যাডাম বিচার করে একটা রায় দিয়ে আমারে একটা কাগজ ধরায়ে দেন। সেটাতে আমার নাম ভুল ছিল। থানায় দায়ের করা অভিযোগের বাদী আমার স্ত্রী, স্বামীর স্থলে নজরুল লেখা হয়। তা সংশোধন করতে ৬ মে সন্ধ্যায় থানায় যাই। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টায় বাড়ি থেকে জানায়, বখাটেরা আমার মেয়েকে তুলে নিতে বাড়িতে হামলা চালায় এবং মেয়েকে নিতে না পারায় আমার রান্না ঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে। বাড়ি ফেরার পর দেখি আমার বাড়িঘর জ্বালাই দিছে। যাওয়ার সময় হুমকি দিয়ে বলে ইভটিজিং করে ২ লাখ টাকা জরিমানা দিয়েছি। এবার তোর মেয়েকে ধর্ষণ করে অ্যাসিড দিয়ে জ্বালিয়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা দিব। রান্না ও ঘরে অগ্নিসংযোগে তিনটি ছাগল ঝলসে যায় এবং আসবাবপত্র পুড়ে যায়। ঘটনাটি উঘারিয়া তদন্তকেন্দ্রের পুলিশকে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ভিকটিমের বাবা আরও বলেন, ‘বিচার বলতে আমি তো কোনো কিছুই পাইনি। এখন মেয়ে আর মেয়ের মারে অন্য জায়গায় লুকিয়ে রাখছি। আমি নিজেও রাস্তাঘাটে বের হতে পারছি না। আতঙ্কে আছি। ভাই আমি সঠিক একটা বিচার চাচ্ছি। এই লোকগুলোর যদি আজকে বিচারের আওতায় না আনতে পারি, তাহলে আমার জীবনটা যাবে আমার মেয়ের জীবনটা যাবে। প্রশাসনের কাছে ঘর পোড়ানোর বিচার না চেয়ে মেয়ের ইজ্জত রক্ষা ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা চেয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন তিনি।
বখাটে রাকিবুল ইসলামের বাবা রফিকুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘বিষয় হলো আমরা তো টোটালি এগুলোর মধ্যে জড়িত না। এই যে চারটা পোলাপাইন আটক হইছে, চারটার মধ্যে কেউ এগুলোর মধ্যে জড়িত না। এটা এলাকার সবাই জানে। এটা হয়তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হতে পারে। পোলাটারে জিজ্ঞেস করছি, বলছে, আমরা ঘুরতে গেছি। এটা সিম্পল একটা বিষয়। তবে বেশি হাইলাইটস হয়ে গেছে। মেয়েটির বাবাদের সঙ্গে পূর্ব বিরোধ ছিল বলেও জানান তিনি। তবে এক প্রশ্নের জবাবে রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পরের দিন টিএনও ম্যাডাম বিচার বসাইছে। মানে আগের দিন সারা রাতে মোটামুটি এর ওপরে বুঝানোর চেষ্টা করছি। থানাতে যাওয়ার পর আসামিপক্ষের লোক বলছে যে, আসলে এটা তো কোনো বিষয় না। এইটা মিট-মাট করিয়া লন। পরে জরিমানা করছে। পরবর্তীতে বাড়িতে আগুন লাগানোর ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ মানে আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি; কিন্তু এরা আইডিয়া করছে যে, যারে জরিমানা করছে, তারা করতে পারে; কিন্তু আমরা প্রতিপক্ষ বা তাদের ক্ষতি করতে হবে এ ধরনের কোন কিছু আমাদের মনে আসে না।’
জানতে চাইলে শাহরাস্তির ইউএনও নাজিয়া হোসেন কালবেলাকে বলেন, ঘটনাটি হচ্ছে যে পুলিশ ছিল ঘটনাস্থলে, স্থানীয়ভাবে আমরা তথ্য পাই আমরাও ছিলাম। যেদিন রায়টা দেওয়া হয়েছে, সেদিন তাদের টাকা সংগ্রহ করার বিষয় ছিল। এ কারণে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করার পরে সব পক্ষকে নিয়ে বসে যেন পরবর্তীতে কোনো বিশৃঙ্খলা না করা হয়, সেজন্য আমি তাদের কাছ থেকে একটি লিখিত নিয়েছি। সেটা আসলে তো আর মোবাইল কোর্ট না; কিন্তু মোবাইল কোর্ট নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ইউএনও বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য আমি পরে দিচ্ছি। এটি এ মুহূর্তে দিতে পারছি না।’
ওসি মীর মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, যেখানে ঘটনা ঘটেছে, সেখানেই মোবাইল কোর্ট বসে বিচার করেছে। এটা বলেই ফোন কেটে দেন। এরপর তার হোয়াটসঅ্যাপে দুটি প্রশ্ন করে বক্তব্য চাইলেও ওসি কোনো বক্তব্য দেননি। ফাঁড়ির এসআই শফিকুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ঘটনাস্থলে ম্যাজিস্ট্রেট ছিল। তাহলে তাদের থানায় নিয়ে আটকে রেখেছিলেন কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জরিমানা তো তাৎক্ষণিক দিতে পারেনি। জরিমানা নেওয়ার জন্য থানায় আটকে রাখছিল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন এবং দোকানদারসহ সবাই বলছে, আপনারা দুজন গিয়ে তাদের থানায় নিয়ে গেছেন? ওখানে তখন কোনো ম্যাজিস্ট্রেট ছিল না—
এমন বক্তব্যের পরে শফিকুর রহমান বলেন, এটা নিয়ে আপনি আমার ওসি স্যারের সঙ্গে কথা বলেন। এটা বলেই ফোন কেটে দেন তিনি।
জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ কালবেলাকে বলেন, থানা পুলিশ আসামিকে ধরে মোবাইল কোর্টের সামনে নিয়ে যাবে—এরপর ম্যাজিস্ট্রেট বিচার করবে, এটা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। এটা আইনের অপব্যবহার। যে ম্যাজিস্ট্রেট এ ধরনের বিচার করেছে তার বিচারিক ক্ষমতা থাকায় উচিত না। তিনি আরও বলেন, যেসব অপরাধ সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেগুলোর বিচার কোনোভাবেই মোবাইল কোর্টে হওয়া উচিত নয়। প্রথম দিকে মোবাইল কোর্টে অল্প কিছুসংখ্যক অপরাধের বিচার করা হতো। এখন এই এখতিয়ার অনেক বেড়েছে। ফলে মোবাইল কোর্ট আইনের অপব্যবহারও বেড়েছে। একটি গোষ্ঠী বিচার বিভাগকে পাশ কাটিয়ে একটি সমান্তরাল বিচার বিভাগ গড়ে তুলতে চাই। বিচারিক ক্ষমতাকে তাদের হাতে রাখতে চাই। এটা বন্ধ না করা গেলে দেশে আইনের অপব্যবহার হতেই থাকবে।
‘ওসিকে আদালতে তলব ও মিথ্যা বক্তব্য প্রদান’
শাহরাস্তিতে ইভটিজিংয়ের অভিযোগে আটক চারজনকে আদালতের পরিবর্তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) মাধ্যমে জরিমানা করায় আইনি প্রশ্ন তোলেন চাঁদপুরের আদালত। আইনগত প্রক্রিয়া লঙ্ঘন এবং বিচারিক এখতিয়ার বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শাহরাস্তি থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) সশরীরে তলব করা হয়। চাঁদপুরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহাদাতুল হাসান আল মুরাদ স্বপ্রণোদিত হয়ে এই বিষয়ে আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়: দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৫০৯ ধারা অনুযায়ী ইভটিজিং একটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। বিশেষ করে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ১০ ধারার অধীনে এটি একটি আমলযোগ্য অপরাধ। এই ধরনের অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম বা সাজা প্রদানের একমাত্র এখতিয়ার জুডিসিয়াল বা আমলি ম্যাজিস্ট্রেটের।
সে অনুযায়ী গত ১২ মে ওসি মীর মাহবুবুর রহমান আদালতে হাজির হয়ে একটি লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উক্ত ইভটিজিংয়ের বিষয়ে স্থানীয় জনগণ কর্তৃক আটকদেরসহ উপস্থিত লোকজনদের জিজ্ঞাসাবাদ-পূর্বক ঘটনাস্থলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ তাকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় উপস্থিত পুলিশের কাছে সহায়তা চাইলে পুলিশ তাকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় সহায়তা করে। একপর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজিয়া হোসেন ভিকটিমকে ইভটিজিংয়ের বিষয়ে ভিকটিমের প্রদত্ত বক্তব্যসহ সাক্ষীদের বক্তব্য শুনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা শেষে আটক চার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে সাত দিনের জেল দেন। ঘটনাস্থলে উত্তেজিত জনতার রোষানল থেকে আসামিদের রক্ষা করার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে আসামিদের নিরাপদ হেফাজতে নিই। পরে উক্ত আসামিদের থানায় নিয়ে মুচলেকা গ্রহণ সাপেক্ষে অভিভাবকদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তবে ভিকটিম কিংবা তার পরিবার অদ্যাবধি পর্যন্ত শাহরাস্তি থানায় কোনো অভিযোগ করেনি বিধায় কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ওসির বক্তব্য গ্রহণ করে আদালত ১৯ মে আদেশের জন্য রেখেছেন।