প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির নারায়ণগঞ্জ শাখার বিরুদ্ধে ভুয়া সেলস কনট্রাক্ট ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার মাধ্যমে শতশত কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে ২৬টি রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়েও ব্যাপক অর্থ লুটপাটের অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা। ব্যাংকের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সৃষ্ট এই ভুয়া ঋণের বোঝা বইতে না পেরে মানসিক চাপে এরই মধ্যে দুই ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে বলেও দাবি তাদের। ভুয়া ঋণের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে এসব পোশাক কারখানার প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান এখন চরম হুমকির মুখে। এসব অনিয়ম-জালিয়াতি প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে দাবি পোশাক কারখানা মালিকদের। গতকাল শনিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। এ সময় নিরপেক্ষ নিরীক্ষা ও তদন্তের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ডয়েস ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত এসব জালিয়াতি হয়। এসময় শুধু ডলারের অবমূল্যায়ন করেই একটা কারখানা থেকেই ১৬১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। এসব টাকা ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. ইকবালের হিসাবে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা কারখানা মালিকদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে, যার কোনো টাকাই তারা ব্যাংক থেকে নেয়নি।
জালিয়াতির অভিনব কৌশল তুলে ধরে বলা হয়, পোশাক কারখানাগুলোর অজান্তেই তাদের নামে ভুয়া ‘আইডি’ ব্যবহার করে জাল সেলস কনট্রাক্ট এবং তার বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে। কাঁচামাল আমদানির পরিবর্তে মূল্য নগদায়নের নামে প্রচলিত দরের চেয়ে ১২ থেকে ১৫ টাকা অতিরিক্ত দরে ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তর করা হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকদের হিসাবে জোরপূর্বক ‘ফোর্সড লোন’ ও ‘ডিমান্ড লোন’ সৃষ্টি করে বিপুল পরিমাণ সুদ আরোপ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি নিট এফওবি মূল্যের ৭৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা না থাকলেও ব্যাংকটি এ নিয়ম সম্পূর্ণরূপে লঙ্ঘন করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির নারায়ণগঞ্জ শাখার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ব্যবসা পরিচালনা করলেও ২০১৭ সাল থেকে ‘ভুয়া’ আইডি ব্যবহার করে জাল সেলস কনট্রাক্ট তৈরি করেন ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। এসব কৃত্রিম কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়, যেখানে বাস্তবে কোনো কাঁচামাল সরবরাহ হয়নি। পরে ওই এলসির বিপরীতে তৈরি দায় চলতি হিসাবের মাধ্যমে নিষ্পত্তি দেখিয়ে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার থেকে ডলার কেনা হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বাজারদরের চেয়ে ১২ থেকে ১৫ টাকা অতিরিক্ত দরে ডলার কেনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ ছাড়া রপ্তানি নথির বিপরীতে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ চলতি হিসাবে জমা দিয়ে পরে সেই অর্থ ব্যবহার করে ডলার ক্রয় ও কথিত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির দায় পরিশোধ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক একতরফাভাবে ফোর্সড লোন ও ডিমান্ড লোন তৈরি করে বিপুল সুদ আরোপ করেছে, যা গ্রাহকদের কোনো নোটিশ ছাড়াই করা হয়।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন লঙ্ঘন করে চলতি হিসাব, নগদ জমা ও ঋণ সৃষ্টি করে এলসি সমন্বয় করা হয়েছে। তবে বারবার পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হলেও ব্যাংক তা দেয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে ফাঁকা চেক ব্যবহার করে অর্থঋণ আদালতে মামলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, পুনঃতফশিলের শর্তে স্বাক্ষর না করলে এলসিসহ অন্য ঋণ সুবিধা বাতিলের হুমকি দেওয়া হতো। এতে কারখানার কার্যক্রম ও শ্রমিকদের বেতন ঝুঁকির মুখে পড়ে। শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়ে কারখানা বন্ধের ঝুঁকি ছিল এবং স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হতো। পরে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুনঃতফসিলে রাজি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাতিল করে দেয়। ফলে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
ব্যাংকের আরোপিত ঋণের পরিমাণ প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করে ভুক্তভোগী ২৬টি প্রতিষ্ঠান। তাদের মতে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোনো বড় অস্বাভাবিক দায় না থাকলেও ২০২৪ সালে হঠাৎ বিপুল অঙ্কের ঋণ দেখানো হয়, যা তারা অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বলে উল্লেখ করেন।
ভুক্তভোগীরা বলেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়াটা কোনো সমাধান হতে পারে না। এতে টাকা পরিশোধের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া কর্মসংস্থান হারাবে কিছু শ্রমিক-কর্মচারী এবং কমে যাবে দেশের রপ্তানি। ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখলেই টাকা পরিশোধ করা সম্ভব। তাই তারা ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে রেখে প্রকৃত দায় পরিশোধ করতে আগ্রহী। এতে প্রতিষ্ঠানও বাঁচবে এবং প্রায় পঁচিশ হাজার শ্রমিকও কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং স্বনামধন্য অডিট ফার্মের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে গত ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর লিখিত আবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।
মানসিক চাপে মৃত্যু ও মানবিক বিপর্যয়: ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভুয়া ঋণের দায় চাপিয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ ও হুমকি দিয়ে আসছিল। এই চাপের মুখে ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর টোটাল ফ্যাশন লিমিটেডের এমডি মো. হাসিবউদ্দিন মিয়া এবং ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ওয়েস্ট অ্যাপারেলের এমডি আসিফ হাসান মাহমুদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া জননী ফ্যাশন লিমিটেডের এমডি স্ট্রোক করে প্যারালাইসিসে ভুগছেন।
এর মধ্যে টোটাল ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসিবউদ্দিন মিয়াকে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদিনে ৩৭ বার ফোন করে ঋণ পুনঃতফসিল করতে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
সংকটে ২৫ হাজার শ্রমিক: ব্যবসায়ীরা জানান, ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের জন্য জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিতে ব্যাংক থেকে ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি বন্ধের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে ফরেইন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট ১৯৪৭ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে এই জালিয়াতি করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
সুষ্ঠু তদন্ত ও অডিট দাবি: পরিস্থিতি উত্তরণে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে গত ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর একটি আবেদন জমা দিয়েছে।
তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত অডিট ফার্ম দ্বারা ব্যাংকের এসব হিসাবের পূর্ণাঙ্গ অডিট করা।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা। ফ্যাক্টরিগুলো সচল রাখার স্বার্থে এবং প্রকৃত দায় নিরূপণের জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রপ্তানি খাত মুখ থুবড়ে পড়বে এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে। এসময় উপস্থিত ছিলেন টোটাল ফ্যাশন লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহরাব বিন হাসিব, জননী ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌতম পোদ্দার প্রমুখ।