জাতীয় বাজেট সামনে এলেই তামাক খাত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কারণ সরকারের সর্বোচ্চ রাজস্ব খাতগুলোর মধ্যে এই খাত অন্যতম। আবার তামাকজনিত স্বাস্থ্যক্ষতিও কমিয়ে আনা প্রয়োজন। দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৯ থেকে ১১ শতাংশ আসে তামাক খাত থেকে। ফলে অর্থনীতির বাস্তবতায় তামাক খাতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এই খাত থেকে বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে। সরকার প্রায়ই তামাক ও তামাকজাত পণ্যের কর ও দাম বাড়িয়ে থাকে। এর প্রধান লক্ষ্য থাকে তামাকের ব্যবহার কমানো ও রাজস্ব আদায় বাড়ানো। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই কৌশল পুরোপুরি কাজে আসছে না।
বর্তমানে তামাক খাতে সর্বোচ্চ শুল্ক-কর থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে তামাকের ওপর শুল্ক-কর ছিল সর্বোচ্চ ৬৩ শতাংশ। এটি দ্রুত বাড়তে বাড়তে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮৩ শতাংশে ঠেকেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। বিশ্ব সংস্থার মতে, তামাকে শুল্ক-কর ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত রাখা উচিত।
প্রশ্ন হলো- তামাকে উচ্চ করহার সত্ত্বেও বর্তমান কর ব্যবস্থা কি তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে?
গবেষণা ও বাস্তবতা বলছে, না। বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং (ইওয়াই)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তামাক করে বহুস্তরভিত্তিক অ্যাড-ভ্যালোরেম (মূল্যভিত্তিক) পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল ও অকার্যকরী হয়ে পড়েছে। এখানে তামাক খাতের কর লাফার কার্ভের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ কর এত বেশি হয়েছে যে, আরো বাড়ালে সরকারের রাজস্ব বাড়ার বদলে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রেও তাই দেখা যাচ্ছে। কর বাড়ানোর পরও গত কয়েক বছরে এ খাতে সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গেছে।
সর্বশেষ গত বছরের একটি উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তামাকে কর ও মূল্য বাড়ানোর পর ওই বছরের প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র ০.৯ শতাংশ। এ ছাড়া ধূমপায়ীর হার কমাতেও যে এ কর কাঠামো কাজে আসছে তা-ও না। বরং কর বা দাম বাড়ানোর পর দেখা গেছে, ধূমপায়ীরা নিম্নস্তরের বা তুলনামূলক কম দামের সিগারেটে চলে যাচ্ছে। ফলে বর্তমানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ সিগারেট বিক্রি হচ্ছে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরে। সিগারেটের কালোবাজারি বাড়ার ফলেও জনস্বাস্থ্যে বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসাইড ম্যাট্রিক্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সিগারেটের বাজারের প্রায় ১৩.১ শতাংশ অবৈধ পণ্যের দখলে। প্রতি মাসে প্রায় ৮৩ কোটি ২০ লাখ শলাকা অবৈধ সিগারেট দেশের বাজারে প্রবেশ করছে। ফলে বৈধ ব্র্যান্ডের বিক্রি কমছে এবং সরকারের রাজস্বে বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সার্বিকভাবে বিদ্যমান করকাঠামো তামাকের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের লক্ষ্য- তিন ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে।
দেশে সিগারেটের কর নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম- এই চার স্তরে বিভক্ত। বহুস্তরভিত্তিক এ করকাঠামো শুধু জটিলই নয়, এটি পুরোপুরি মূল্যভিত্তিকও। বর্তমানে বিশ্বে খুব কম দেশ এখন তামাকে মূল্যভিত্তিক কর পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ ছাড়া বহুস্তর ব্যবস্থা প্রশাসনিক ভাবেও উপযুক্ত নয়। কর নির্ধারণ, তদারকি ও আদায়ে জটিলতা বাড়ে। একই সাথে বছর বছর কর বাড়ানোর ফলে অবৈধ সিগারেটের বাজারও বিস্তৃত হয়। সীমান্তপথে চোরাই সিগারেট প্রবেশ, লাইসেন্সবিহীন উৎপাদন এবং কর ফাঁকি এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। বাজারে অবৈধ পণ্য যত বাড়বে, সরকারের রাজস্ব ক্ষতিও তত বাড়বে।
শুধু বছর বছর কর ও দাম পরিবর্তন করে রাজস্ব বাড়ানো এবং ধূমপায়ীর হার কমানোর চেষ্টা টেকসই সমাধান নয়। বর্তমান বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল তামাক করনীতি। প্রথমত, প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে কর কাঠামো সহজ করা প্রয়োজন। বর্তমান বহুস্তরভিত্তিক অ্যাড-ভ্যালোরেম বা মূল্যভিত্তিক তামাক কর পদ্ধতির পরিবর্তে স্পেসিফিক বা সুনির্দিষ্ট তামাক করকাঠামোর দিকে যাওয়া উচিত। এতে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে। পূর্বানুমানযোগ্য কর থাকায় বাজার ও বিনিয়োগও স্থিতিশীল থাকবে। বাংলাদেশেও সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, পরিবর্তনটি হতে হবে ধীর ও পরিকল্পিত। তামাক খাতে অপরিকল্পিত কর বৃদ্ধি বাজারে ধাক্কা ও অবৈধ বাণিজ্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। তাই ৫-১০ বছরের একটি রোডম্যাপের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যকর করাই বাস্তবসম্মত হবে। আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াংয়ের (ইওয়াই) গবেষণায়, এ সম্পর্কিত মডেল ব্যবহার করে দেখা গেছে, বর্তমান করহার অপরিবর্তিত রেখেই দামের স্তরগুলো ধীরে ধীরে একক ন্যূনতম মূল্যে একীভূত হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের থেকে ২০৩৫-৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় প্রতি বছর ৯.২ শতাংশ হারে বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো নীতি সফল হবে না। সীমান্ত, বন্দর ও উৎপাদন পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ‘ট্র্যাক-অ্যান্ড-ট্রেস’ প্রযুক্তি চালু এবং লাইসেন্সবিহীন উৎপাদন ও চোরাই সিগারেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি।
তামাকের ব্যবহার কমানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইভাবে বড় দায়িত্ব হলো রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে দেশের উন্নয়নে অর্থের সংস্থান করা। শুধু কঠোর আইন বা কর বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং তামাক করকাঠামো বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। যেটি বাস্তবায়ন করলে রাজস্ব আদায় বাড়বে, পাশাপাশি ধূমাপয়ীর হারও কমে আসবে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকেই সরকারের সেই দূরদর্শিতা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন অনেকে।