আলি জামশেদ বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ
একদিকে ভৈরবকে জেলা করার আশ্বাস দিচ্ছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য, জেলা বিএনপির সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম; অন্যদিকে ভৈরব ও কুলিয়ারচর ঘেঁষা মেঘনা-ভৈরব নদীপথে চলছে ব্যাপক বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী থেকে দিন-রাত ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য, নদীর নাব্যতা, তীরবর্তী বসতি ও কৃষিজমি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বিশেষ করে প্রায় ৯ কোটি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৫ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গবেষক ও পরিবেশ সচেতন মহলের আশঙ্কা, অনিয়ন্ত্রিতভাবে এ কার্যক্রম চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নদীভাঙন, ভূমিধস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাব আরো তীব্র হতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে নদীতীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জে অতীতে এ মাত্রায় বালু উত্তোলনের সুযোগ ছিল না। তবে ১৪৩২ ও ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ এর আওতায় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ইজারা কার্যক্রম চালু হওয়ার পর একটি প্রভাবশালী মহল নদী থেকে বৃহৎ পরিসরে বালু উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করে নেয়।
সরকারি দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৪৩২ বঙ্গাব্দে মেঘনার ভৈরব বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের জন্য মেসার্স নাগিব এন্টারপ্রাইজ ১৬ কোটি ৯৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকায় ইজারা লাভ করে। ইজারার আওতায় প্রায় এক হাজার ৬১০ দশমিক ২৫৮ একর নদী এলাকা থেকে ৯ কোটি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৫ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়।
পরবর্তীতে একই এলাকার আরেকটি ইজারা নেন রফিক ব্রাদার্স অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও ভৈরব উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, চলতি বছর প্রায় ১৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকায় তিনি ভৈরবের একমাত্র বালুমহালের ইজারা নিয়েছেন। ইজারাকৃত এলাকা মেঘনা নদীর মূল প্রবাহ ও শাখা নদীঘেঁষা সাদেকপুর ও রৌদা মৌজাজুড়ে বিস্তৃত। তবে নদীপথের দৈর্ঘ্য নিয়ে তাঁর বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। একবার তিনি আট কিলোমিটার সীমারেখার কথা বললেও, পরে ১২ কিলোমিটারের কথা উল্লেখ করেন।
আইনি কাঠামো ও বাস্তবতার প্রশ্ন
আইন অনুযায়ী বালু উত্তোলনের জন্য দরপত্র আহ্বান, পরিবেশগত ছাড়পত্র, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ, নদীর নাব্যতা মূল্যায়ন, সেতু-কালভার্ট ও জনবসতির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বাধ্যতামূলক। একই সাথে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ এবং নদী রক্ষা কমিশনের মতামতও প্রয়োজন হয়।
এছাড়া ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার বাইরে ড্রেজার ব্যবহার, নদীতীর ঘেঁষে বালু উত্তোলন এবং নিষিদ্ধ এলাকা থেকে বালু তোলা দণ্ডনীয় অপরাধ। ইজারার শর্ত ভঙ্গ হলে প্রশাসনের ইজারা বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে এসব শর্ত কতটা মানা হচ্ছে তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সীমার বাইরে এবং অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় বহুগুণ বেশি বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পাড়ের স্থিতিশীলতা ও আশপাশের পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। নদীর গভীরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে পানির স্রোতের চাপ তীরের দিকে বাড়ে, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ নদীভাঙনের কারণ হতে পারে।
পরিবেশ গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নদীর নির্দিষ্ট স্থানে গভীর গর্ত তৈরি হলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এতে আশপাশের কৃষিজমি, বসতভিটা, গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ে। একই সাথে ড্রেজিংয়ের কারণে নদীর পানি ঘোলা হয়ে যায়, মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয় এবং জলজ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর তলদেশে বহু দেশীয় মাছ ডিম ছাড়ে। ড্রেজিংয়ের ফলে সেই পরিবেশ নষ্ট হলে মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এছাড়া ড্রেজারের শব্দ, তেল ও যান্ত্রিক দূষণের কারণে নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের আরেকটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে পরিবর্তন। নদীর তলদেশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে গেলে আশপাশের টিউবওয়েল ও সেচ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘এক মাসেই বছরের টার্গেটের বালু তোলা সম্ভব’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নদীপাড়ের এক যুবক অভিযোগ করে বলেন, ‘যেভাবে ড্রেজার বসিয়ে দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে নদীপাড়ের মানুষ ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়বে। প্রতিবাদ করলে প্রভাবশালীদের কারণে বিপদে পড়তে হয়।’ তিনি দাবি করেন, ‘১৬ ইঞ্জিনের একটি ড্রেজার দিয়েই দিনে ৮০ থেকে ৯০ হাজার ঘনফুট বালু তোলা সম্ভব। সেখানে একসাথে ৭ থেকে ১০টি ড্রেজার পুরো মৌসুমজুড়ে কাজ করে। সেই হিসাবে এক বছরের অনুমোদিত বালু খুব অল্প সময়েই তুলে ফেলা সম্ভব।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার অভিযোগ করেন, ভৈরব থেকে বালু উত্তোলন শুরু হওয়ার পর বাইরের বালুবাহী বাল্কহেড আসা কমে গেছে। ফলে স্থানীয় বাজারে বালুর দাম বেড়েছে। এমনকি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পেও বেশি দামে বালু কিনতে হচ্ছে।
বিজ্ঞানীর সতর্কবার্তা
কিশোরগঞ্জের এক আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিকই থাকে। কিন্তু যদি ক্ষতির আশঙ্কা বেশি হয়, তাহলে জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা উচিত।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন ভবিষ্যতে ভূমিধস, নদীভাঙন ও স্রোতধারার পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। ভৈরব-মেঘনা নদীর দুই পাড়ে বহু পুরনো জনপদ রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় গভীর গর্ত তৈরি হলে তীরবর্তী বসতি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। একই সাথে মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ইজারাদারের বক্তব্য
রফিক ব্রাদার্স অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জধভরয়ঁষ ওংষধস বলেন, ‘হাইড্রোলিক টেস্ট, পরিবেশগত সমীক্ষা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সব ধরনের সরকারি অনুমোদনের ভিত্তিতেই সরকার দ্বিতীয়বারের মতো আমাকে ইজারা দিয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘আশপাশের গ্রাম বা ফসলি জমির ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সরকার কখনোই লিজ দিতো না।’
কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমের সম্পৃক্ততার গুঞ্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে বালু উত্তোলনের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই।’
প্রশাসনের অবস্থান
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশীদ এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে পরে তথ্য দেবেন বলে উল্লেখ করলেও পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য, জেলা বিএনপির সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশগত সমীক্ষা, নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ছাড়া এ ধরনের বৃহৎ বালু উত্তোলন কার্যক্রম ভবিষ্যতে নদী ও জনপদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা জরুরি।