দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ইস্পাতশিল্প বর্তমানে নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে। শতভাগ আমদানিনির্ভর এ ভারী শিল্পকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে তীব্র ডলারসংকট, টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং চলতি মূলধনের ঘাটতি। ফলে সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছে দেশের অধিকাংশ কারখানা।
ইস্পাতশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং টিকে থাকার লড়াই নিয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে খোলামেলা কথা বলেছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ ইস্পাত ব্যবসায়ী ও জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল। তিনি বলেন, পুঁজির অভাবে দেশের বেশির ভাগ কারখানা ডলারে কাঁচামাল কিনে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। বাজারে চাহিদা ও ভালো দাম থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কারখানা তিন শিফটের পরিবর্তে এক বা সর্বোচ্চ দুই শিফটে পরিচালিত হচ্ছে। আলমাস শিমুল জানান, বর্তমানে এক শিফটে দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ তিন শিফটে উৎপাদন চালানো গেলে প্রতিদিন সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টন পর্যন্ত ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হতো। এতে কয়েক গুণ বেশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতো। ইস্পাতের দাম বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় কারখানা চালাতে না পারায় কম উৎপাদনের বিপরীতে বিশাল অঙ্কের ব্যাংক সুদ গুনতে হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘৭ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের সুদ দিতে হচ্ছে মাত্র দেড় হাজার টন উৎপাদনের বিপরীতে। উৎপাদন যদি সাড়ে ৩ বা ৪ হাজার টনে নেওয়া যেত, তাহলে প্রতি টনে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমানো সম্ভব হতো। এর সুফল ভোক্তারাও পেতেন।’
আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারসংকট এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ঘাটতিকে বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জানান, ইস্পাতশিল্পের সব কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় সবসময় বিপুল পরিমাণ স্ক্র্যাপ, কেমিক্যাল ও রিফ্যাক্টরি সামগ্রী মজুত রাখতে হয়। কিন্তু ডলারসংকট ও তারল্য সমস্যার কারণে অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এলসি খুলতেই হিমশিম খাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে ডলারের দাম ৩০ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে একই পরিমাণ কাঁচামাল আমদানিতে এখন অনেক বেশি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে পারছেন না, মিলও ঠিকমতো চালাতে পারছেন না।’ ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব তুলে ধরে আলমাস শিমুল বলেন, ২০১৯ সালে ‘কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস’ প্রযুক্তি চালুর সময় প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৫ টাকা। পরে তা বেড়ে ১৩২ টাকা পর্যন্ত ওঠে। বর্তমানে তা ১২২-১২৩ টাকার মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগে ৮৫ কোটি টাকা দিয়ে ১ কোটি ডলার কেনা যেত, এখন একই ডলার কিনতে লাগছে ১২২ থেকে ১২৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ও কর পরিশোধও এখন বেশি টাকার ওপর করতে হচ্ছে। এতে শিল্প পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।’
ইউপাস বা ডেফার্ড এলসির কারণে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, আগে ছয় মাস বা এক বছর মেয়াদে এলসি খুলে কাঁচামাল এনে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির পর ডলার পরিশোধ করা হতো। কিন্তু পরিশোধের সময় ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ডলারে ১৮ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘৪৫০ ডলারের এক টন স্ক্র্যাপ আমদানিতে যদি প্রতি ডলারে ৪৫ টাকা করে বাড়তি দিতে হয়, তাহলে প্রতি টনে প্রায় ২০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়। এতে স্টিল ব্যবসায়ীদের মূলধন কার্যত শেষ হয়ে গেছে।’