Image description

রাজধানীর কারওয়ান বাজার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এই বাজারকে বলা হয় দেশের বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা কাঁচাবাজার।সমগ্র দেশ থেকে মাছ, মাংস, শাক-সবজি, ডিমসহ নিত্যপণ্য নিয়ে ভিড় করেন পাইকাররা। কেনাবেচা চলে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। কিন্তু বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ল, এখানে যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে অসুখের নানা রকম উপাদান। সিটি করপোরেশনের অবহেলায় বিরক্ত ক্রেতা-বিক্রেতারা।

গত সোমবার পেট্রোবাংলার সামনে দিয়ে বাজারে ঢুকতেই দেখা যায় কিচেন মার্কেট। সামনে বিভিন্ন শাক-সবজির দোকান। একটু এগোতেই চোখে পড়ল মুরগি ও ডিমের সারি সারি দোকান। ড্রেনের ওপর মুরগি জবাই, কাটাছেঁড়া করছিলেন কয়েকজন দোকানি। মুরগির পালক, রক্ত ও বর্জ্যের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশে। নাকে হাত চেপে ক্রেতা সাধারণ চলছে। কিচেন মার্কেটের দোতলা পাবলিক টয়লেটে গিয়ে দেখা গেল, ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। মেঝেতে জমে আছে পানি, দেয়ালের বিভিন্ন অংশ কালচে হয়ে গেছে। অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। পাবলিক টয়লেট হলেও নারীদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। বাজারে কেনাকাটা করতে আসা নারী ক্রেতাদের জন্য এটি বড় ধরনের ভোগান্তি বলে জানান কয়েকজন।

ড্রেনের ওপর বসে বাজার

বাজার থেকে বের হয়ে কিচেন মার্কেটের পেছনের অংশ ও ইলেকট্রনিক মার্কেটের সামনে দিয়ে কাঁচাবাজারে ঢুকতেই দেখা যায় আরেক চিত্র। অনেক দোকান বসেছে সরাসরি রাস্তার ওপর। কেউ ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করছেন, কেউ ছাতা টাঙিয়ে, আবার কেউ পলিথিন বিছিয়ে মাছ বা সবজির পসরা সাজিয়েছেন। এতে বাজারের ভেতরের সড়ক অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। হাঁটার মতো জায়গা নেই বললেই চলে। এলাকাজুড়ে ছিল তীব্র দুর্গন্ধ। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা ময়লা, পচা শাক-সবজি ও মাছ-মাংসের বর্জ্য থেকে এ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

কাঁচাবাজারের পেছনের অংশ এবং ইলেকট্রনিক মার্কেটের সামনের সরু গলিতে দেখা যায় আরো করুণ চিত্র। পুরো রাস্তার ওপর জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও নোংরা পানি। সেই ময়লার ওপর দিয়েই মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে। এর ঠিক পাশে বসেছে অস্থায়ী দোকানপাট।

ওই রাস্তার ওপরই শাক-সবজির দোকান নিয়ে বসেছেন সেলিম হোসেন। তিনি জানান, আওয়ামী লীগের আমলে কয়েক দিন পরপরই উচ্ছেদ অভিযানের কবলে পড়তে হতো তাঁদের। তবে অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের আমলে তাঁরা বেশ ভালোই আছেন। ভেতরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বলতে সরু একটি পাইপ লাগানো হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে ওই রাস্তায়।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভালো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় এখানে মানুষ খুব কম আসে। তাই বেচাকেনাও একদম কম।

পাশে থাকা আরেক দোকানি বাবুল মিয়া বলেন, এখানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কারো কোনো নজর নেই। আমাদের নানাবিধ অসুখে পড়তে হয় এই পরিবেশে। আগে সিটি করপোরেশনের একটি অফিস ছিল, এখন সেটিও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব দোকানের বেশির ভাগেরই কোনো বৈধ অনুমতি নেই। তবু বছরের পর বছর ধরে তারা রাস্তা দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

সড়কেই ময়লার ভাগাড় : সরেজমিনে কারওয়ান বাজারের ভেতরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো আলাদা স্থান বা ডাস্টবিন দেখা যায়নি। বাজারে নেই সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফার্মগেট অংশে রয়েছে বেশ কয়েকটি ফলের আড়ত। তার পাশেই জনতা টাওয়ার ও আইটি পার্ক। ঠিক সামনেই বিশাল ময়লার ভাগাড়। রাস্তার পাশে স্তূপ হয়ে জমে আছে আবর্জনা। ভাগাড় থেকে পলিথিন ব্যাগসহ বিভিন্ন ধরনের অনুসঙ্গ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন মো. সালাম মিয়া। কাজের ফাঁকে কথা বলতে বলতে তিনি জানান, পুরো বাজারের যত রকমের ময়লা আছে, তা এখানেই ফেলা হয়। মাঝে মাঝে সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে কিছু আবর্জনা নিয়ে গেলেও বেশির ভাগ পড়ে থাকে।

ঠিক ওই সময় নাকে কাপড় পেঁচিয়ে বাজার নিয়ে যাচ্ছিলেন দেলোয়ারা বেগম। কালের কণ্ঠের পরিচয় দিতেই তিনি বলেন, এখন আমাদের এসব অভ্যাস হয়ে গেছে। আমরা ময়লা খেয়েই বড় হচ্ছি। এসব ময়লা-আবর্জনা এখানে থাকার কথা না। কিন্তু সিটি করপোরেশন কোনো ব্যবস্থা নেয় না। কেনাকাটা করতে আসা আমিনুল ইসলাম, সেলিনা বেগমসহ বেশ কয়েকজন ক্রেতা জানান, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই বাজারে এলেও পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। বিশেষ করে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও ময়লার কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার ও বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তাঁরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই কাঁচাবাজারে প্রতিদিন কোটি টাকার বেচাকেনা হলেও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনো কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ক্রেতা, বিক্রেতা ও পথচারীদের।

দুর্গন্ধে নাজেহাল জনজীবন : রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা মিরপুর-১১। প্রতিদিন হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় এখানকার কাঁচাবাজারে। তবে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, তীব্র দুর্গন্ধ, জলাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনায় চরম ভোগান্তির শিকার হাজার হাজার মানুষ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হলেও যথাযথ তদারকি এবং ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের প্রধান প্রবেশমুখ থেকেই শুরু হয়েছে বিশৃঙ্খলা। সড়কের দুই পাশে অস্থায়ী দোকান, সবজির ভ্যান বসানোয় পথচারীরা ভোগান্তির শিকার। বাজারের ভেতরের সরু রাস্তা কাদা ও ময়লায় ভরা। কোথাও ড্রেনের ময়লা পানি উপচে ছড়িয়ে পড়ছে বাজারে। কোথাও কাঁচা বর্জ্য পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কারওয়ান বাজারের মতো এখানেও চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। আকরাম রনি নামের এক ক্রেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, মাছ-মাংস যেখানে বিক্রি হয়, সেদিক দিয়ে তো হাঁটাই যায় না। এত দুর্গন্ধ, কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই অজ্ঞান হওয়ার দশা। সিটি করপোরেশনের এসব চোখে পড়ে না।

মো. ইখলাসুর রহমান নামের আরেকজন বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই বাজারে পানি জমে যায়। এতে একদিকে যেমন দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। মাছ ও মাংস বিক্রির অংশে দুর্গন্ধ এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে। মুরগি বিক্রেতা তৈবুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন নিয়মিত ময়লা নেয় না। তাই পুরো বাজারে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিবেশের সমাধান হোক, এটা আমাদেরও চাওয়া।

অনুমোদনহীন বাজারে নির্বিঘ্নে অনিয়ম : রাজধানীতে সিটি করপোরেশনের অনুমোদনহীন কাঁচাবাজার আছে কয়েক শ। এর মধ্যে ১২টি বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও সড়কে, কোথাও ফুটপাত, আবার কোথাও সরকারি জমি দখল করে চলছে এসব বাজার। অবৈধ বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না।

উত্তরা, খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী, বনানী, আজিমপুর, কাপ্তানবাজার, শ্যামবাজার, মালিবাগ, মগবাজার, মহাখালী, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রতিটি মোড়েই অনুমোদনহীন কাঁচাবাজারের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ভ্যানে করে, আবার কোথাও ফুটপাতে চৌকি বসিয়ে এসব বাজার চলছে। অনেক আবাসিক এলাকার গলিতেও গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ বাজার।

দক্ষিণ কুড়িলে শেওড়াবাজার ঘুরে দেখা গেছে, যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়েছে বর্জ্য। মাছ বাজারে দুর্গন্ধ। সরু গলিতেই বসানো হয়েছে এই বাজার। শুধু তাই নয়, বাজার থেকে বের হলেই সড়কের দুই পাশে বসেছে কাঁচাবাজার ও বিভিন্ন দোকানপাট। এতে প্রতিনিয়ত যানজট লেগেই থাকে এই সড়কে। একই চিত্র দেখা গেছে মহাখালী আরজতপাড়া বাজারেও। যেখানে-সেখানে বসানো হয়েছে দোকান; বেড়েছে যানজট, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। বাজারের বর্জ্য ফেলা হয় ড্রেনে, ফলে বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি জমে যায় গোটা এলাকায়। মো. করিম নামের এক দোকানি বলেন, শাক-সবজির ময়লাগুলো মাঝেমধ্যে ড্রেনেই ফেলে দেওয়া হয়। যারা ফেলে, তাদের অনেক নিষেধ করার পরও ফেলে। এতে ড্রেনে পানিপ্রবাহ কমে যায়, বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি হয় পুরো এলাকায়।

মো. হাবিবুল্লাহ এই বাজারের নিয়মিত ক্রেতা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ড্রেনের অবস্থা এমন যে একপশলা বৃষ্টি হলেই প্যান্ট পরে বাজারে আসা মুশকিল হয়ে যায়। বাজারে ঢুকতেই হাঁটুপানি। এসব দেখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের থাকলেও বছরে একবার তারা দেখতেও আসে না। তারা শুধু ট্যাক্স নেওয়ার সময় আসবে। সাধারণ মানুষ কী অবস্থায় আছে, সেদিকে তাদের কোনো খেয়াল নেই।

অপরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট : যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় চার রাস্তার মোড়ে রয়েছে একটি পাবলিক টয়লেট। বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ঠিকমতো পরিচর্যা করা হয়নি। পুরো ভবন পোস্টার ও ব্যানারে ঢাকা। ওপরে শুধু একটি সাইনবোর্ডে লেখাঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পাবলিক টয়লেট।

টয়লেটের সামনের সিঁড়ির নিচে জমে আছে স্যাঁতসেঁতে নোংরা পানি। দূর থেকেই দুর্গন্ধ নাকে আসে। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, দুই পাশে মোট ছয়টি টয়লেট। এর মধ্যে তিনটি নারী ও তিনটি পুরুষদের জন্য। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। কোথাও টিস্যু নেই, নেই হাত ধোয়ার সাবান বা পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও। টয়লেটগুলোর ভেতরের অবস্থা আরো নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর।

টিকিট কাউন্টারে থাকা একজন কর্মী বলেন, এটা ইজারা দেওয়া। এখানে তেমন আয় হয় না। তাই বেশি খরচও করা যায় না। টয়লেট ব্যবহার শেষে বের হয়ে পথচারী ইসমে আজম আবিদ বলেন, ভেতরের অবস্থা খুবই খারাপ। বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হয়েছে। অথচ এসব টয়লেট পরিষ্কার থাকার কথা। কিন্তু ভেতরে এত নোংরা আর দুর্গন্ধ যে অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো অবস্থা।

এক নারী ব্যবহারকারী বলেন, হাত ধোয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট থাকলেও সেখানে পুরুষদেরও যেতে দেওয়া হয়। প্রবেশপথ ছোট হওয়ায় অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। জায়গাও খুব সংকীর্ণ। এসব টয়লেট মোটেও নারীবান্ধব না।

একই চিত্র দেখা গেছে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকার আরেকটি পাবলিক টয়লেটে। বাইরে থেকে দেখলে এটিকে অনেকটা দোকান বা ছোট মার্কেট মনে হয়। টয়লেটের সামনেই রয়েছে দুটি চায়ের দোকান।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেখানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। নেই টিস্যু, সাবান বা হ্যান্ডওয়াশের ব্যবস্থা। চারদিকে ময়লা ও দুর্গন্ধে ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।