Image description

দেশের মাদক পরিস্থিতি বর্তমানে নতুন এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মাদকের ওপর সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে কোণঠাসা মাদক কারবারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

গত ২০ দিনে নাটোর, নারায়ণগঞ্জ, সাতক্ষীরা এলাকায় পুলিশ, র‌্যাব ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে সংঘবদ্ধ মাদক কারবারিচক্র। এ ধরনের হামলার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগে মাদক কারবারিরা অভিযানের খবর পেলে গা-ঢাকা দিত, কিন্তু এখন নিজেদের অবৈধ কারবার অক্ষুণ্ন রাখতে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে তারা পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তা ও সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত ১ মে থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার পর থেকে মাদক কারবারিরা কোণঠাসা হয়ে সন্ত্রাসী হামলার পথ বেছে নিচ্ছে। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সারা দেশে ১৯ হাজার ৪৯টি মাদক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এক হাজার ৯৪০টি মামলা হয়েছে। বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর গত ১২ দিনে শুধু রাজধানী থেকে ৪৩৩ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
 
এই বিশেষ অভিযানের ফলে মাদক কারবারিদের সরবরাহ ব্যবস্থা বা চেইন ভেঙে পড়ায় তাদের মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা থেকেই তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন।

মাদকের শক্তিশালী সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হামলার মুখে পড়ছেন র‌্যাব সদস্যরা। গত ৫ মে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অভিযান চালাতে গেলে মাদক কারবারিদের অতর্কিত হামলার শিকার হন র‌্যাব-১১-এর একটি সিভিল টিমের সদস্যরা। ওই হামলার ঘটনায় তিনজন র‌্যাব সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে গত মঙ্গলবার নাটোরের লালপুরে।

সেখানে মাদকবিরোধী অভিযানের প্রস্তুতিকালে মাদক কারবারিরা সংঘবদ্ধ হয়ে র‌্যাব-৫-এর সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এতে আশিকুর রহমান, মিনহাজুল ইসলাম, আল আমিন ও রিয়াজুল করিমসহ পাঁচজন সদস্য আহত হন। শাহীন নামের এক সদস্যকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা গেছে, এএসআই পারভেজ মুন্সির নেতৃত্বে সিভিল পোশাকে থাকা র‌্যাব সদস্যরা মাদক স্পট শনাক্ত করতে গেলে স্থানীয় মাদক সম্রাট সোহাগের নেতৃত্বে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাসুদ পারভেজ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে র‌্যাব কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মাদক কারবারিদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা প্রথমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছি, এরপর অভিযানে যাচ্ছি।

অন্যদিকে গত মঙ্গলবার সাতক্ষীরার আশাশুনির বড়দল এলাকায় সংঘবদ্ধ মাদক কারবারিদের হামলায় আহত হন স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সবুর সানা, কবির হোসেন সানা ও সোহেল হোসেন। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের অভিযোগ, হামলাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদকের কারবার চালিয়ে আসছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় মাদক কারবারিরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। এ বিষয়ে আশাশুনি থানার ওসি শামীম আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, এমন একটি ঘটনার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি আসলে কী তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। 

গত ১৫ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা রেললাইন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান ও কনস্টেবল আরিফ হোসেন। পুলিশের দাবি, মাদকবিরোধী অভিযানের সময় আটক দুই ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নিতে তাদের সহযোগীরা হামলা চালায়।

মাদকবিরোধী অভিযানে সম্মুখ ভাগে থাকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারাও রয়েছেন ঝুঁকিতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বেশ কিছুদিন আগে মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ সীমান্তবর্তী মুকসুদপুরে এক মাদক কারবারিকে ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন পাঁচ কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তারা মাদক কারবারির ঘরে তল্লাশি করতে যান, তখন অপরাধীরা কৌশলে ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার শুরু করে। এতে এলাকাবাসী বিভ্রান্ত হয়ে কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা কর্মকর্তাদের ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাপ ও পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদের অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, মাদক কারবারিরা এখন আর শুধু পেশিশক্তিতেই নয়, তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবেও সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে।

মাদক কারবারিদের সশস্ত্র হামলা মোকাবেলায় বর্তমানে কৌশল পরিবর্তন করছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরটির উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদক কারবারিরা এখন অস্ত্র বহন করে। তাদের মোকাবেলা করতে আমাদের কর্মকর্তারা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন। তিনি জানান, বর্তমানে রাজশাহীর পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে (পিটিসি) ডিএনসির অন্তত ৫০ জন কর্মকর্তাকে কঠোর শারীরিক ও অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণ শেষ হলে তাঁদের পিস্তল ও রিভলবার সরবরাহ করা হবে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, সশস্ত্র প্রশিক্ষিত বাহিনী নিয়ে মাদক স্পটে অভিযান চালালে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সহজ হবে এবং কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঝুঁকি কমবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদকের এই ভয়াবহতা রুখতে সরকারি অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তাও নজর কেড়েছে। মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা শিবচর উপজেলাকে মাদকমুক্ত করতে যুগান্তকারী এক ঘোষণা দিয়েছেন। গত ১০ মে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, শিবচরে কেউ মাদক কারবারিকে ধরিয়ে দিতে পারলে আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, মাদক সংশ্লিষ্টতায় তাঁর নিজের দলের কেউ বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাঁকেও বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর এই ঘোষণা তৃণমূল পর্যায়ে মাদকবিরোধী অবস্থানকে আরো জোরালো করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে শিবচরের এই মডেল বর্তমানে সারা দেশে আলোচনার বিষয়।