স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ যে পেটেন্ট ছাড় সুবিধা পাচ্ছে, তা শেষ হলে আন্তর্জাতিক কোম্পানির লাইসেন্স ছাড়া অনেক ওষুধ উৎপাদন সম্ভব হবে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, বেড়ে যেতে পারে ওষুধের দামও। গতকাল সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব বিষয় উঠে আসে। ‘এলডিসি উত্তরণ প্রেক্ষাপটে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উদ্ভাবন শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক ইনসেপশন কর্মশালাটি যৌথভাবে আয়োজন করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট। বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে বিনিয়োগ না বাড়ালে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
একই সঙ্গে ক্যান্সারসহ জটিল রোগের নতুন প্রজন্মের ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কোম্পানির লাইসেন্স ছাড়াই অনেক জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করতে পারছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কম থাকছে এবং তুলনামূলক কম দামে ওষুধ বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এলডিসি সুবিধা শেষ হলে পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, নতুন পেটেন্টধারী ওষুধ উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স নিতে হবে, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মানতে হবে এবং বায়োইকুইভ্যালেন্স ও বায়োসিমিলার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের এখনো সেই সক্ষমতা তৈরি হয়নি।
ফলে বিদেশে পরীক্ষা করাতে হবে, বাড়বে উৎপাদন ব্যয়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ক্যান্সার ও জটিল রোগের ওষুধে। এসব ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কর্মশালায় ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অধ্যাপক হামিদ বলেন, ২০১৮ সালের এপিআই নীতিমালায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় গড়ে ওঠা এপিআই শিল্পপার্কও এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যাচিউরিটি লেভেল ৩ অর্জনেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের (বিএআইএমএ) সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান বলেন, ২০১৬ সালে এডিবি’র অধীনে এ বিষয়ে একটি গবেষণা হয়েছিল।
পরে ২০১৮ সালে নীতিমালাও করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নে অগ্রগতি খুবই সীমিত। তার মতে, নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া এই শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে এডিবি’র সহযোগিতা করতে পারে কিনা প্রশ্ন রাখেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এলডিসি সুবিধা হারালে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়বে।
বিশেষ করে পেটেন্ট ছাড়, কমপ্লায়েন্স ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের বাধ্যবাধকতার কারণে ওষুধের দাম বাড়তে পারে এবং রপ্তানি সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তবে তিনি বলেন, গবেষণা, বায়োটেকনোলজি ও এপিআই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে কোনো গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার ভাষায়, ইন্ডাস্ট্রি হবে প্রাইস টেকার, প্রাইস মেকার নয়।
ড. তিতুমীর আরও বলেন, ওষুধ শিল্পে বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় না বাড়ালে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অধিকারভিত্তিক ও সর্বজনীন করতে চায়। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিবর্তে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা বলয় গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।