Image description
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে ‘অপপ্রচারের’ বিরুদ্ধে মাঠে নামছে বিএনপি। একই সঙ্গে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ তৃণমূলে তুলে ধরতেও ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটি। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সারা দেশের জেলা ও মহানগরে কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এই চিঠি সারা দেশের জেলা ও মহানগরে পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, ‘সব জেলা-মহানগর এবং দলের স্বীকৃত অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে কর্মসূচি দেওয়ার জন্য আপনাদের নির্দেশ দেওয়া হলো।’ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে।

তবে সাংগঠনিক সভা ও কর্মী সভার মাধ্যমে দল ও সংগঠনকে সক্রিয় করাই চিঠি দেওয়ার উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা। দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি সরকারে থাকার কারণে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারগুলো পালন করতে থাকব।’

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রে সরকার কাজ করবে এবং বিরোধী দল তার সমালোচনা করবে, এটিই স্বাভাবিক। তবে সেই সমালোচনা এবং কর্মসূচি যেন গঠনমূলক হয়। সরকারের ভুল ধরিয়ে দিলে রাষ্ট্র আরও কার্যকর হয়। বিরোধী দল যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য অনবরত মিথ্যাচার করে, সেটিকে ষড়যন্ত্র বলা হয়। আমরা সেই ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় জনগণের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিষ্কারভাবে বলেছেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ বিএনপি অক্ষরে অক্ষরে মানতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু বিরোধীরা জুলাই সনদ নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। তাই জনগণকে যাতে বিভ্রান্ত না করতে পারে, সেজন্য দলের অবস্থান জানাতে লিফলেট বিতরণ করা হবে। তিনি জানান, কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যে লিফলেট জেলা ও মহানগরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই লিফলেট সারা দেশে ব্যাপকভাবে প্রচার করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য জনগণের মাঝে তুলে ধরারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, শুরুর পর এক মাস সারা দেশে ধারাবাহিক এ কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। এর মধ্যে উঠান বৈঠক, পথসভা, লিফলেট বিতরণ, মতবিনিময় সভা, মিছিল এবং সরাসরি গণসংযোগের মতো কর্মসূচি থাকতে পারে। জেলা, মহানগর, উপজেলা, ইউনিয়নসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এ কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব জেলা ও মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হবে না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

সূত্র আরও জানায়, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিরোধীদের প্রচারণার জবাব দিতে সারা দেশে লিফলেট পাঠানো হয়েছে। লিফলেটে বলা হয়েছে, গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে ‘খ’ নম্বর প্রশ্নটি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি এবং তা ‘প্রতারণামূলক’। একই সঙ্গে লিফলেটে উল্লেখ রয়েছে, বিএনপি জুলাই সনদ অনুযায়ী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত সনদ বিএনপি ‘অক্ষরে অক্ষরে’ মানতে বদ্ধপরিকর। এছাড়া লিফলেটে সংসদে নারী প্রতিনিধি বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচনসহ যেসব বিষয় ইতোমধ্যে বিরোধী দল লঙ্ঘন করেছে, তাও তুলে ধরেছে বিএনপি। পাশাপাশি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী যে সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে মর্মে বলা আছে, তাও তুলে ধরা হয়েছে। লিফলেটে আরও উল্লেখ রয়েছে, গণভোটের ‘ঘ’ প্রশ্নে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। তা বিএনপি অক্ষরে অক্ষরে মানতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বিএনপির নেতারা বলছেন, সম্প্রতি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সমালোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে ‘সংস্কারবিরোধী’ হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে চাপে রাখতে পরিকল্পিত এসব প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জুলাই সনদ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। সেখানেও বলা আছে, যে দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে, তারা তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করবে। বিএনপি সব সময়ই বলে আসছে, জুলাই সনদে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করেছে, সেই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। এখন সনদ নিয়ে বিরোধীরা যা বলছে, তা জনগণকে বিভ্রান্ত করা ছাড়া আর কিছু নয় বলেও মনে করছে বিএনপি।

দলটির নেতারা আরও অভিযোগ করেন, হাম পরিস্থিতিকেও রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে ব্যবহার করছে বিরোধী দলগুলো। অথচ আগের সরকারের সময় টিকাদান কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, যার প্রভাব এখন দৃশ্যমান। বরং বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

গত ৯ মে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও নেতাদের সরাসরি জনগণের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি নেতাকর্মীদের কাছে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে সহযোগিতা চান এবং সরকারের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরতে এবং ‘ভুল তথ্যের’ জবাব দিতে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। এর পরপরই বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে এ চিঠি দেওয়া হলো।