Image description
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এনবিআরের বৈঠক আজ

রাজস্বের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপণ্য সরবরাহে উৎসে কর বাড়তে পারে। এছাড়া বাড়তে পারে অর্ধশত পণ্য ও সেবার ভ্যাট-সম্পূরক শুল্ক। উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী বিশেষত দোকানদারদের ভ্যাটের জালে আনতে নতুন রূপে ফিরতে পারে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’। তবে অপরিবর্তিত থাকছে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা। অতি ধনীদের ওপর বসতে পারে সম্পদ কর। পাশাপাশি রপ্তানি প্রণোদনার উৎসে কর দ্বিগুণ হতে পারে। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মোটরসাইকেল নিবন্ধনে বসতে পারে অগ্রিম আয়কর।

বাজেট চূড়ান্ত করতে আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্ব বৈঠকে আরও অংশ নেবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থ সচিব, বাণিজ্য সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানসহ বাজেটসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলেই এসব বিষয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

প্রথা অনুযায়ী প্রতিবছর বাজেট প্রণয়নের আগে এনবিআর বাণিজ্য সংগঠন, খাতভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন, বিভাগীয় ও জেলা চেম্বার, অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে। এসব বৈঠকে প্রাপ্ত সুপারিশ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়। সেই রূপরেখা চূড়ান্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে এনবিআর।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবে এনবিআর। এতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরের প্রস্তাবনাগুলো উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন-ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা, করপোরেট কর হার, রপ্তানির উৎসে কর, পণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট-সম্পূরক শুল্ক আরোপের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। সে অনুযায়ী বাজেট চূড়ান্ত করা হয়।

সূত্র জানায়, এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে নিত্যপণ্য সরবরাহে উৎসে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। ধান, ধানের কুড়া, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, মটর, বছালা, মসুর, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ডাল, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্যতেল, চিনি, বীজ, পাটকাঠি, সরিষা, তিল, কাঁচা চা-পাতা, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, তেজপাতা এবং পাট সরবরাহের উৎসে কর দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করা হতে পারে। এতে বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

পাশাপাশি রপ্তানি প্রণোদনার উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হতে পারে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে রপ্তানি প্রণোদনার জন্য সরকার ৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। আগামী অর্থবছরেও রপ্তানি পরিস্থিতি ও প্রণোদনার হার অপরিবর্তিত থাকলে উৎসে করের হার দ্বিগুণ করার মাধ্যমে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারে।

উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী বিশেষত দোকানদার-মুদি ব্যবসায়ীদের ভ্যাট জালের আওতায় আনতে প্যাকেজ ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে। যেসব ব্যবসায়ী টার্নওভারের করের সীমার কারণে নিবন্ধনের বাইরে থাকছেন, মূলত তাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মাসে এক হাজার টাকা অর্থাৎ বছরে ১২ হাজার টাকা হারে প্যাকেজ ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি জাল বাড়াতে ভ্যাট নিবন্ধন (বিআইএন) প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে টিআইএনের মতো অনলাইনে আবেদন করে বিআইএন নেওয়া যাবে। বর্তমানে ভ্যাটের নিবন্ধন নিতে হলে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হয়। পাশাপাশি আগামী বছর ব্যাংকে চলতি হিসাব খুলতে বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এছাড়া পাস্তা, ফলের রস, আইসক্রিম, কার্বোনেটেড বেভারেজ, প্রসাধনীসামগ্রী, সিগারেট-বিড়ি, জর্দা-গুলের সম্পূরক শুল্ক বাড়তে পারে। এমএস প্রডাক্ট, রেডসিড অয়েল, কোলজা সিডস অয়েল ও কেনোলা অয়েলের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হতে পারে।

অন্যদিকে আমদানি পণ্যের শুল্ক হারেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের শর্ত হিসাবে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও অনেক পণ্যের শুল্ক হার কমানো হবে। তবে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচকে ধোঁয়াবিহীন তামাকের ন্যায় শুল্ক ধার্য করা হতে পারে।

জানা যায়, ২০২৫ জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ই-সিগারেট আমদানি, উৎপাদন, বিপণন ও পরিবহণ নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ থেকে ই-সিগারেটের অংশটি বাদ দেয়। সংসদে পাশের পর ১০ এপ্রিল সংশোধিত আইনের গেজেট প্রকাশ হয়। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ই-সিগারেট আমদানি, উৎপাদন, বিপণনের দ্বার উন্মেচিত হয়। একই সঙ্গে ধোঁয়াবিহীন তামাকের মতো এসব পণ্যের ওপর কর আরোপের মাধ্যমে এক ধরনের পরোক্ষ বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো মনে করছে।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, ফ্লেভারে ভিন্নতা থাকায় ই-সিগারেট তরুণ প্রজন্মের মাঝে ভয়াবহ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো হচ্ছে না। উলটো ধোঁয়াবিহীন তামাকের মতো শুল্ক ধার্য করে এর বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। সরকার যদি এ পণ্য থেকে রাজস্ব আদায় করতেই চায়, তাহলে সিগারেটের মতো উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, সামান্য বিদেশি বিনিয়োগের জন্য ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ আমদানির বৈধতা দেওয়া উচিত হবে না। এই পণ্য থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করবে, তার কয়েকশগুণ বেশি স্বাস্থ্য খাতে সরকারকে ব্যয় করতে হবে। তাই ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।