আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে কমিয়ে ‘নেতিবাচক’ করেছে। তবে দেশের বর্তমান ঋণমানের রেটিং ‘বি পজিটিভ’ অপরিবর্তিত রেখেছে সংস্থাটি। বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিচ জানিয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্স ও জ্বালানি আমদানিতে ঝুঁকি, সরকারের ধীরগতির সংস্কার এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে এই পূর্বাভাস কমানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, পূর্বাভাস কমানোর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে, যা আগামী দিনে বৈদেশিক ঋণ ও বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
সংস্থাটি বলেছে, নতুন সরকারের সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সদিচ্ছায় অনিশ্চয়তা রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈদেশিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে এবং সুশাসনব্যবস্থাও দুর্বল। এসব কারণে সামান্য আঘাতেই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাঘাত ঘটতে পারে জ্বালানি আমদানিতে। মূল্যস্ফীতির হার উচ্চমাত্রায় থাকতে পারে। এসব কারণে প্রবৃদ্ধির হারও বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক দিক থেকে ঝুঁকির মাত্রা বাড়ায় এবং অভ্যন্তরীণ খাতে নানা দুর্বলতা প্রকট হতে থাকায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস কমানো হয়েছে। দেশের নীতি কাঠামো, সরকারি অর্থায়ন ও আর্থিক খাতে সংস্কারে ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। ক্রমাগতভাবে দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের কারণে অর্থনৈতিক খাতে ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। এতে আরও বলা হয়েছে, দেশের সরকারি খাতের ঋণ এখন মাঝারি মাত্রায় রয়েছে। সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ এখনো আছে। এ দুটির সদ্ব্যবহার করতে পারলে আগামী দিনে ঝুঁকি মোকাবিলা করা যাবে। এসব বিবেচনায় ঋণমানের রেটিং অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি উপকরণ আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে আঘাত আসতে পারে। এমনটি হলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। কেননা বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। যুদ্ধের স্থায়িত্ব বেড়ে গেলে এ খাতে ধাক্কা আরও প্রকট হতে পারে।
ফিচ বলেছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি রয়েছে। এর মানে, বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে বৈদেশিক খাত থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। এর মধ্যে আইএমএফ-এর ঋণ কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় আগামী দিনে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ব্যাংক খাতে সুশাসন শক্তিশালী করা ও সরকারি ব্যাংকগুলোয় স্বচ্ছতা ফেরাতে আইনি কাঠামোতে সংস্কার আনার বিষয়ে সরকার ধীরগতির নীতি গ্রহণ করেছে। গণভোটের মাধ্যমে সমর্থিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো স্থবির হয়ে আছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাপক করছাড়, দুর্বল কর প্রশাসনের কারণে রাজস্ব আদায়ে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে, যা সরকারের আর্থিক ক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে।