Image description
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছর

উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছরে নতুন ঋণ নেয় ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার। চড়া সুদ ছাড়াও ঋণের বড় অংশই ছিল কঠিন শর্তের জালে বন্দি। গণ-অভ্যুত্থানে পতনের বছরে তীব্র ডলার সংকটের কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয় শেখ হাসিনা সরকার, বাড়ানো হয় মেয়াদ। এতে একদিকে ঋণের সুদ যেমন বেড়েছে, তেমনি দণ্ড সুদ বা বাড়তি সার্ভিস চার্জ আরোপের ফলে মূল ঋণের পরিমাণও বেড়ে যায়। ওইসব ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে ডলারের সংকট ক্রমেই প্রকট হয়েছে। পাশাপাশি ডলারের দামও বেড়েছে। কমেছে টাকার মান। এতে করে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বিদেশি ঋণ পরিশোধের এখনো প্রবল চাপ রয়েছে। এজন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপও বাড়ছে। এতে ডলারের দামও কিছুটা বেড়েছে। সব মিলে সেই বৈদেশিক ঋণের চাপ এখন জনগণের ঘাড়ে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ২০০৯ সালের শুরুতে ডলারের দাম ছিল ৬৯ টাকা। তবে ক্ষমতা ছাড়ার সময়ে ২০২৪ সালের আগস্টে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ টাকা। এমনকি ব্যাংকে ১৩২ টাকা দরেও ডলার বিক্রি হয়েছে। একই সময়ের ব্যবধানে বেড়েছে বৈদেশিক ঋণের সুদের হারও। ২০০৯ সালের শুরুতে বৈদেশিক ঋণের সুদহার ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশ। কোনো কোনো খাতে আরও কম। এখন ঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ থেকে ৯ শতাংশ। ২০২২ থেকে ২৪ সালে বৈশ্বিক মন্দার সময়ে এ হার আরও বেশি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী মোট ঋণের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ঋণের সুদ ও বিনিময় হারই বাজারভিত্তিক হবে। অর্থাৎ ঋণ যখন পরিশোধ করা হবে তখন বাজারে যে সুদহার ও ডলারের দাম যা থাকবে ওই হারে পরিশোধ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ডলারের দাম বেড়েছে ৫১ টাকা। এতে সমান হারে টাকার মান কমেছে। ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে নিয়মিত বাড়তি সুদের পাশাপাশি দণ্ড সুদ বা সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। মোট ঋণের প্রায় ৭৬ শতাংশ চড়া সুদ ও কঠিন শর্তের ঋণ। এসব শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকারকে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াতে হয়েছে। এসব মিলে বৈদেশিক ঋণের অর্থ অপব্যবহারের ফলে সব চাপ পড়েছে জনগণের ওপর।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেপরোয়া বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার কারণে এখন ওই সব ঋণ পরিশোধের চাপও বেশি। সরকারি বা বেসরকারি খাতের প্রতিটি ঋণের বিপরীতেই রাষ্ট্র বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্যারান্টি রয়েছে। ফলে অনেক ঋণগ্রহীতা এখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও বা জেলে থাকলেও ওইসব ঋণ এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে পরিশোধ করতে হচ্ছে। বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রাহকের নামে ফোর্স লোন সৃষ্টি করে বাজার থেকে চড়া দামে ডলার কিনে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। সূত্রমতে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মোট বিদেশি ঋণের ৭৮ শতাংশই নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। বাকি ২২ শতাংশ নেওয়া হয়েছে অন্যান্য সরকারের আমলে।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঋণের প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত শুধু সরকারি খাতেই ৪০০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে হবে। এরপর থেকে ঋণ পরিশোধ কমতে থাকবে। সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ শোধ করার নিয়ম হচ্ছে রাজস্ব আয় বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে টাকা দেবে সরকার। ওই অর্থ দিয়ে ডলার কিনে ঋণ শোধ করা হবে। এখন অর্থনৈতিক মন্দায় রাজস্ব আয় কম হওয়ায় বৈদেশিক ঋণ শোধের জন্য টাকার জোগান রাজস্ব আয় থেকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারকে স্থানীয়ভাবে ঋণ নিয়ে তা দিয়ে ডলার কিনে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৭ ডলারে। অথচ ২০০৯ সালের শুরুতে ছিল ১৬৯ ডলার। এ হিসাবে আলোচ্য সময়ে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৪৩৮ ডলার। মাথাপিছু মোট বৈদেশিক ঋণের ৭০ দশমিক ৫১ শতাংশই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেড়েছে। বাকি ২৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়েছে অন্যান্য সরকারের আমলে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মাথাপিছু বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৭ ডলারে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়-আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থাৎ ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। ক্ষমতা ছাড়ার সময়ে ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৪১ কোটি ডলারে। আলোচ্য সময়ে দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার।

সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপে পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ যুদ্ধের অজুহাতে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে এখন রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশি ঋণ ও অনুদান বাবদ যেসব বৈদেশিক মুদ্রা আসে তা দিয়ে আমদানি ব্যয়, সেবা খাতের ব্যয়, বেসরকারি খাতের ঋণ পরিশোধ করার পর বাড়তি ডলার থাকছে না। ফলে রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে সরকারি খাতের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভে চাপ বেড়েছে। অথচ আগে দৈনন্দিন আসা ডলার থেকে ওইসব ব্যয় মিটিয়ে যা উদ্বৃত্ত থাকত তা দিয়ে সরকারি খাতের ঋণ শোধ করা হতো।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়েও বছরে বৈদেশিক ঋণ বাবদ পরিশোধ করা হতো ১৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডলার। এখন পরিশোধ এত বেড়েছে যে, শুধু গত অর্থবছরেই পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে পরিশোধের পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সে অনুপাতে দেশের রিজার্ভ না বাড়ায় এখন ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাত একেবারেই কম। এ অনুপাত এখন ২৩ শতাংশে নেমেছে। ২০২০ সালে যা ছিল ৬০ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সেগুলো উন্নয়ন খাতে ব্যয় করলে কিছুটা সুফল মিলত। কিন্তু ঋণের টাকার একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে বিদেশি ঋণের টাকায় দেশে কিছুই করা হয়নি। বরং দেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ায় দেশের দায় বেড়েছে। সাধারণত বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তা যদি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়-এমন সব প্রকল্পে ব্যয় করা হলে তাহলে পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছে তার প্রায় সবই খরচ করা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রা নির্ভর প্রকল্পে। ফলে দুভাবে ওইসব ঋণ অর্থনীতিতে ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। এক. পাচার করে ও দুই. স্থানীয় অর্থ আয় নির্ভর প্রকল্পে ব্যয় করে। যে কারণে এখন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী রিজার্ভ বাড়ানো যাচ্ছে না। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এ নেতিবাচক প্রভাব আরও বেড়েছে। যার সরাসরি দায় বহন করতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।