বগুড়ার শিবগঞ্জে অবস্থিত ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় জাদুঘরের ৪৭টি অত্যন্ত মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা মূর্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ২০০৭ সালে ফ্রান্সের মিউজিয়ামে প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো এসব প্রত্নসম্পদ দেশে ফেরার পর সেগুলো আসল না কি নকল (রেপ্লিকা), তা যাচাই করতে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর জাতীয় এই সম্পদের সুরক্ষা ও সত্যতা নিশ্চিত করতে বগুড়া-২ শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উদ্যোগ নিয়েছেন।
বিগত ২০০৭ সালে বাংলাদেশের তিনটি জাদুঘর থেকে বিপুলসংখ্যক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ফ্রান্সের ‘গীমে মিউজিয়ামে’ প্রদর্শনীর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যে মহাস্থান জাদুঘরের ৪৭টি মূর্তি ছিল বলে জানা গেছে। ওই সময় একটি লট পাঠানোর পর দ্বিতীয় লটের একটি মূর্তি বিমানবন্দর থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। এই ঘটনার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রত্নবস্তুগুলো বাংলাদেশে ফেরত আসে। তবে সেই সময় ফেরত আসা মূর্তিগুলো আসল ছিল কি না, তা নিয়ে কোনো যথাযথ কারিগরি পরীক্ষা বা অনুসন্ধান করা হয়নি। গত ১১ই মে ২০২৬ তারিখে শিবগঞ্জ উপজেলায় একটি সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এই বিষয়ে তার গভীর উদ্বেগের কথা জানান। তিনি সভায় বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে বড় সন্দেহ হচ্ছে যে হাজার কোটি টাকার মূল্যবান মূর্তিগুলো যেগুলো ফ্রান্সে গিয়েছিল, সেগুলো কি অরিজিনাল ফেরত এসেছে নাকি রেপ্লিকা হিসেবে ফেরত এসেছে?”
প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ২০০৭ সালের এই ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও বিগত সময়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিষয়টি আমলে নেননি। তিনি এই ঘটনাকে জাতীয় সম্পদের অবমাননা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এটি একটি হাজার কোটি টাকার সম্পদ এবং এটি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। আমরা এটি আজকে নোটিশে এনেছি।” তিনি আরও জানান যে, এই বিষয়ে তিনি ইতিমধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে মৌখিকভাবে কথা বলেছেন এবং তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করবেন।
প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) একটি ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যেই গঠন করেছেন। কমিটির সভাপতি শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সদস্য সচিব, কাস্টোডিয়ান, মহাস্থান জাদুঘর। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক বিভাগ এবং এলজিইডি’র প্রতিনিধি (উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর নিম্নে নয়), র?্যাব-১২-এর প্রতিনিধি (সহকারী পুলিশ সুপারের নিম্নে নয়), উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, সহকারী পুলিশ সুপার (শিবগঞ্জ সার্কেল) এবং শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ। এই কমিটিকে সরজমিন তদন্ত সম্পন্ন করে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কমিটির প্রধান কাজ হবে জাদুঘরের স্টোররুমে এবং প্রদর্শনীতে থাকা ৪৭টি মূর্তির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা এবং সেগুলো আসল কি না তা নিশ্চিত করা।
উল্লেখ্য, মহাস্থানগড় প্রায় ২২শ বছরের প্রাচীন ইতিহাসের ধারক। এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো কেবল আর্থিক মূল্যে বিচার্য নয়, এগুলো বাঙালির জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি সত্যিই আসল প্রত্নবস্তুর পরিবর্তে রেপ্লিকা ফেরত আসার ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা হবে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রত্নতাত্ত্বিক জালিয়াতি। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক ও কাস্টোডিয়ানদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হবে। কোন মূর্তিটি বিমানবন্দর থেকে গায়েব হয়েছিল এবং সেটি মহাস্থান জাদুঘরের কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কাস্টোডিয়ানের সংক্ষিপ্ত রিপোর্টে কিছু অসঙ্গতি থাকায় পুরো বিষয়টি এখন এই বিশেষ তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে।
তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিলে প্রতিমন্ত্রী সেই তথ্য নিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। জাতীয় এই সম্পদের সুরক্ষায় যদি কোনো অনিয়ম ধরা পড়ে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। মহাস্থানগড়ের এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো শুধু বগুড়ার নয়, এগুলো বিশ্বের ইতিহাসের অংশ। তাই এই তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সচেতন দেশবাসী।