Image description
পুরোনো প্রকল্পেও বাড়ছে ব্যয় ও মেয়াদ

বিএনপি সরকারের তৃতীয় একনেক সভায় অনুমোদন পেতে যাচ্ছে বড় বাজেটের ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রকল্প তালিকার অধিকাংশই ভবন নির্মাণ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, অফিস কমপ্লেক্স কিংবা স্থাপনা উন্নয়নকেন্দ্রিক। এর বাইরে পানিসম্পদ, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতের কয়েকটি বড় প্রকল্পও রয়েছে, যেগুলোর ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে এই একনেক সভায় বহুল আলোচিত বিশাল ব্যয়ের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, আজ বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হবে চলতি অর্থবছরের ১১তম এবং বিএনপি সরকারের তৃতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন একনেক সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একনেকের তথ্য অনুযায়ী, সভায় ১৬টি প্রকল্পের মধ্যে নতুন ৯টি, সংশোধিত ৬টি এবং মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত ১টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এরই মধ্যে প্রকল্পগুলো অনুমোদনের জন্য যাচাই-বাছাই করে প্রস্তুত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

একনেক সূত্রে জানা যায়, একনেকে অনুমোদন পেতে যাওয়া ১৬টি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ৩১৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যার অধিকাংশই বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৯ হাজার ৯৮ কোটি ৬ লাখ টাকা, বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১৭২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রকল্প প্রস্তাবকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৪৩ কোটি ৭ লাখ টাকা।

একনেক কার্যতালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন ও সংশোধিত মিলিয়ে ১৬টি প্রকল্পের মধ্যে অন্তত ১০টিই সরাসরি ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামো উন্নয়নকেন্দ্রিক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নির্বাচন, সংস্কৃতি, ভূমি প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যালয় নির্মাণও রয়েছে এ তালিকায়। একনেকের তালিকায় ভবনের আধিক্য থাকলেও বেশিরভাগ ব্যয় হবে পানিসম্পদ, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতের কয়েকটি বড় প্রকল্পে। আর সবচেয়ে বেশি ব্যয় হবে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে।

ভবননির্ভর প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ‘সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্প। দেশের ৬১ জেলার ১৫০ উপজেলায় নতুন ভূমি অফিস নির্মাণের জন্য প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪০৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হিসেবে কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, ভূমি রেকর্ড সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং সেবাপ্রার্থীদের জন্য আধুনিক পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় তোলা হচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিমসটেক সচিবালয়ের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর গুলশানে ১৫ তলা ভিতবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন আধুনিক

সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ১০ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে ১২২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বিমসটেক সচিবালয়ের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জেলা শহরে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট কেন্দ্রে উন্নীতকরণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্পও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ২৯ জেলার মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রকে ৩০ শয্যার ‘হাসপাতালে’ উন্নীত করা হবে। এর মধ্যে ২৮টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র পুনর্নির্মাণের এবং একটি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২৮টি নতুন ৯ তলা ফাউন্ডেশনসহ ৮ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

স্থানীয় সরকার বিভাগ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নতুন নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্পও স্থান পাচ্ছে একনেকে। নগর ভবন নির্মাণে খরচ হবে ২৫০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সংকট নিরসনে ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ। এই প্রকল্পে খরচ হবে ৩৮৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস পুনর্নির্মাণ প্রকল্পও উপস্থাপন করা হবে একনেকে সভায়, ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত এই প্রকল্পে খরচ ৫৯৩ কোটি টাকা।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন’ এবং ‘গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ’ প্রকল্পও রয়েছে তালিকায়। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সারাদেশে উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস এবং সার্ভার স্টেশন নির্মাণ করতে চায়। সেই প্রকল্পও তোলা হবে একনেকে। এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণসংশ্লিষ্ট।

এ ছাড়া আগেই অনুমোদিত দুটি প্রকল্প একনেক সভাকে অবহিত করার জন্য উপস্থাপন করা হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, ময়মনসিংহের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিমানবাহিনী ঘাঁটি কুর্মিটোলায় বিমানসেনা ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প। একনেকে অনুমোদনের পাশাপাশি অবহিতকরণ প্রকল্প দুটিও ভবন নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রকল্প।

তবে এবারের একনেকের তালিকায় শুধু ভবন নয়, বড় অঙ্কের পানি সম্পদ ও কৃষি অবকাঠামো প্রকল্পও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প। এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনা, সেচ সুবিধা ও পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ নামের মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনর্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ শুরু করেছিল। প্রাথমিকভাবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন করা হবে। ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রথম ধাপের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী—এই পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হবে।

এ ছাড়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাস’ প্রকল্পও একনেক তালিকায় রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বৃহত্তর যশোর জেলার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও সেচ এলাকা উন্নয়ন’ প্রকল্পটিও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং সেচ সুবিধা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে রয়েছে ‘ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ধনুয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ’ প্রকল্প। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করবে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

এদিকে পুরোনো প্রকল্পে ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রবণতাও অব্যাহত রয়েছে। ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্পটি পঞ্চমবারের মতো মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘হাই-টেক সিটি-২’ প্রকল্পও তৃতীয় দফা সংশোধনের জন্য উঠছে একনেকে। ‘মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পটিও আবার সংশোধনের জন্য আনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজনীয় হলেও ভবননির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনা দীর্ঘ মেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে পারে না যদি সেখানে জনবল, পরিচালন সক্ষমতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হয়। অতীতে বহু সরকারি ভবন নির্মাণের পর বছরের পর বছর অকার্যকর পড়ে থাকার নজির রয়েছে। ফলে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস্তব চাহিদা, ব্যবহারযোগ্যতা, পরিচালন ব্যয় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সাবেক পরিকল্পনা কমিশন সচিব মো. মামুন আল রশিদ কালবেলাকে বলেন, দেশে ইনফ্রাস্ট্রাকচারের নামে এরই মধ্যে বহু ভবন তৈরি করা হয়েছে এবং অনেকগুলোই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে—এটা সর্বজন স্বীকৃত। তিনি বলেন, অনেক সরকারি দপ্তরের লক্ষ্যই থাকে শুধু ভবন নির্মাণ করা এবং এর পেছনে প্রায়ই অসৎ উদ্দেশ্য থাকে; তারা প্রকৃত চাহিদার তোয়াক্কা করে না। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর উচিত ছিল বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা। অথচ একনেক তালিকায় থাকা ভবন নির্মাণ প্রকল্পগুলো দেখলে মনে হবে, অগ্রাধিকার নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে মোটেও চিন্তা করা হয়নি।

মামুন আল রশিদ মনে করেন, ঢালাওভাবে ভবন নির্মাণ কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে না। নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে আগের ভবনগুলো কী অবস্থায় আছে তা দেখার জন্য প্রকৃত সার্ভে বা জরিপ করা প্রয়োজন। চাহিদা এবং বাস্তবতার পর্যবেক্ষণ না করে এসব প্রকল্প নেওয়া ঠিক নয়। তিনি বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের এ ক্ষেত্রে আরও কঠোর হওয়া উচিত। যেহেতু তারা সব মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবগুলো একত্রে দেখতে পায়, তাই তাদের দায়িত্ব হলো এই অসামঞ্জস্যগুলো নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা।