Image description

চট্টগ্রামের একটি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় গত ৬ মে হাই কোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন মোহাম্মদ ইলিয়াস নামে এক ব্যক্তি। একই দিন একই ধরনের ঢাকার আরেক মামলায় জামিন পান তামীম রহমান নামে আরেক ব্যক্তি। তবে মূল ঘটনা এটি নয়। প্রকৃত ঘটনা, এই দুই জামিন আবেদনই দ্রুত শুনানিতে কার্যতালিকায় কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়ে সেদিনের কার্যতালিকায় (৬ মে) পরপর দুটি মামলা অনিয়ম করে কজলিস্টে যুক্ত করা প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন।

জানা গেছে, কার্যতালিকা তৈরিতে দুর্নীতি রোধে হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে আবেদন দাখিলের তারিখ অনুযায়ী কলাম তৈরি করা হয়ে থাকে। সে সিরিয়ালের ভিত্তিতে মামলা শুনানির জন্য আসে। এই নিয়ম কঠোরভাবে প্রতিপালন করা হয়ে থাকে হাই কোর্টে। তবে আইনজীবীদের অভিযোগ, অনেক সময় সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কার্যতালিকায় সিরিয়াল এগিয়ে আনতে ‘কলাম ব্রেক’ করা হয়, যা গুরুতর অনিয়ম। অনুসন্ধান বলছে, এই দুই মামলার ক্ষেত্রেও কলাম ব্রেক করার ঘটনা ঘটেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(খ) ধারায় করা একটি মামলায় গত ৬ মে হাই কোর্টের অ্যানেক্স ১৪ নম্বর বেঞ্চ থেকে জামিন পান মোহাম্মদ ইলিয়াস। তার জামিন আবেদনটি সেদিন ক্রিমিনাল আপিল হিসেবে কার্যতালিকার ১৮৯ নম্বর ক্রমিকে ছিল (ক্রিমিনাল আপিল নম্বর ২২২২/২০২৬)। কার্যতালিকায় এই মামলাটি সেদিন রাখা হয়েছিল ১৯ এপ্রিল দাখিল করা মামলার কলামে। তবে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এ মোহাম্মদ ইলিয়াসের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে ২৮ এপ্রিল। এরপর ট্রাইব্যুনালের নামঞ্জুর আদেশের বিরুদ্ধে ৫ মে হাই কোর্টে ক্রিমিনাল আপিল আবেদন দাখিল করা হয়। অথাৎ হাই কোর্টে জামিন আবেদন ফাইল হওয়ার অন্তত দুই সপ্তাহ আগের তারিখ দেখানো হয়েছে এই আবেদনটির সাবমিট ডেট হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে ২৮ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে নামঞ্জুর হওয়ার মামলা ১৯ এপ্রিল সাবমিট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখানে অনিয়মের মাধ্যমে কলাম ব্রেক করে দ্রুত শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই মামলার তথ্য-প্রমাণ খুঁজতে গিয়ে সামনে এসেছে সেদিন কার্যতালিকায় থাকা ১৮৮ নম্বর মামলাটিও (ক্রিমিনাল আপিল নম্বর ২০৪৯/২০২৬)। এই মামলাটিতেও একই ধরনের গুরুতর অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল ধর্ষণের অভিযোগের এক মামলায় তামীম রহমান নামে এক ব্যক্তির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭। এরপর হাই কোর্টে ক্রিমিনাল আপিল ফাইল করেন তিনি। এই মামলাটিও ১৯ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট হাই কোর্টে দাখিল করা মামলাগুলোর কলামে রাখা হয়েছিল কার্যতালিকায়। এখানেও একইভাবে কলাম ব্রেকের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মামলাসংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগ, হাই কোর্টের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ও কিছু অসাধু কর্মচারী এবং প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা এ ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে কার্যতালিকায় মামলার অবস্থান বদল, দ্রুত তালিকাভুক্তি অভিযোগও পুরোনো।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এমন ঘটনা ঘটে থাকলে এটি একটি গুরুতর অনিয়ম বা বেআইনি কাজ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দুটি ঘটনার মধ্যে একটি মামলার বাদী (আইনি বাধ্যবাধকতায় নাম প্রকাশ করা হলো না) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২৮ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫, চট্টগ্রাম) জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর বিদ্যুৎগতিতে হাই কোর্টে জামিন শুনানি হয়েছে। আমার প্রতিপক্ষ অনেক টাকার মালিক। সে টাকা খরচ করে অনিয়মের মাধ্যমে দ্রুত জামিন শুনানি করিয়েছেন। কলাম ব্রেকের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও টাকা লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বেঞ্চ কর্মকর্তা মো. মীর কাশেম। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রতিদিন অনেক মামলার ম্যানশন স্লিপ জমা হয়। এ বিষয়টি ভুলবশত হয়ে থাকতে পারে। আইনজীবীর ম্যানশন স্লিপ অনুযায়ী মামলা কার্যতালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এখানে আমার কোনো দায় নেই। তবে এখানে কোনো অর্থনৈতিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের কোর্টে প্রতিদিন অনেক পরিমাণ মামলার চাপ থাকে। তাই আমার পক্ষে শুধু মামলার আইনগত বিষয় দেখা সম্ভব হয়। এর বাইরে আর কিছু দেখার সুযোগ আমি পাই না।