দেশে হামের ব্যাপক সংক্রমণের মধ্যেই নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে আরেক প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ ডিপথেরিয়া। প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এ রোগ এখন আবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় শনাক্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের কমে যাওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে পরিস্থিতি বিপজ্জনক দিকে যাচ্ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সিলেট, হবিগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীর একাধিক হাসপাতালেও এ রোগে আক্রান্তদের অনেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরই মধ্যে এ রোগে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, চলমান হাম পরিস্থিতির মধ্যে ডিপথেরিয়ার বিস্তার শুরু হলে শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। তাই সে ধরনের পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সেই লক্ষ্যে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
সংক্রমণের শুরু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে: ডিপথেরিয়ার বড় প্রাদুর্ভাব প্রথম দেখা যায় ২০১৭ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ওই বছরের ৩ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে ১৫ জনের মৃত্যুসহ ৮০৪ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ১০ নভেম্বর, মেদসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ) একটি ক্লিনিকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, আক্রান্তদের ৭৩ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরের নিচে এবং এর ৬০ শতাংশই নারী। মারা যাওয়া ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জনই ছিল শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তখনই সতর্ক করেছিল, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঘনবসতি,অপুষ্টি ও কম টিকা গ্রহণ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল।
সতর্কতার পরও কার্যকর প্রস্তুতি হয়নি: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আগাম সতর্কতা সত্ত্বেও দেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সার্ভিল্যান্স তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সিলেট ও হবিগঞ্জে, ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) এবং ২৫ মার্চ কামরাঙ্গীরচরে ডিপথেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট ও ২৪ সেপ্টেম্বর আইডিএইচে, ২৬ আগস্ট তেজগাঁওয়ের ইমপালস হাসপাতালে এবং ৮ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী শনাক্ত হয়। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেওয়া রোগীটি কিশোরগঞ্জ থেকে সংক্রমিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালেও ডিপথেরিয়ার রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি সংক্রমণের নীরব বিস্তারের ইঙ্গিত। সরকার যদি এ সময়ে নীরব থাকে, তাহলে মারাত্মক সংক্রামক এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, মূলত রোহিঙ্গা জনবসতিতে প্রথম ডিপথেরিয়া শনাক্ত হয়। পরে দেশের বিভিন্ন জেলায় রোগী পাওয়া গেছে। কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্যও রয়েছে। হাম-পরবর্তী সময়ে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়লে দেশে করুণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ডিপথেরিয়া টিকার বুস্টার ডোজ চালু করতে হবে। ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের লক্ষ করে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো গেলে দ্রুত ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
কী এই ডিপথেরিয়া: ডিপথেরিয়া বা করিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া হলো একটি গ্রাম-পজিটিভ, মুগুর-আকৃতির ব্যাকটেরিয়া. যা জীবনঘাতী সংক্রামক রোগ ডিপথেরিয়ার জন্য দায়ী। এটি অত্যন্ত সংক্রামক ও গুরুতর রোগ, যা গলা, নাক ও শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। এটি টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ তৈরির মাধ্যমে গলায় একটি পুরু ধূসর আস্তরণ সৃষ্টি করে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট, গিলতে সমস্যা এবং হার্ট বা স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে। এটি মূলত হাঁচি-কাশির ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায় এবং এর সর্বোত্তম প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো টিকাদান। ঐতিহাসিকভাবে ‘শিশুদের শ্বাসরোধকারী দেবদূত’ নামে পরিচিত এ ব্যাকটেরিয়া প্রধানত ঊর্ধ্ব শ্বাসনালিকে সংক্রমিত করে, তবে এটি ত্বকের ক্ষতও (কিউটেনিয়াস ডিপথেরিয়া) সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, ডিপথেরিয়ার প্রধান লক্ষণ হলো গলা ব্যথা, জ্বর, ঘাড়ের গ্রন্থি ফুলে যাওয়া এবং গলায় ঘন ধূসর পর্দা বা আস্তরণ পড়া। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা ব্যবহৃত জিনিসপত্র (তোয়ালে, খেলনা) থেকে এবং সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এ জীবাণু ছড়ায়। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির অধীনে ডিপিটি ও পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা প্রদান এবং হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখার মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। টিকা না নেওয়া শিশু, জনাকীর্ণ স্থানে বসবাসকারী এবং অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ডিপথেরিয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ: ডিপথেরিয়া নিয়ন্ত্রণে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, ডিপথেরিয়া অ্যান্টিটক্সিন, অ্যান্টিবায়োটিক এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচির ওপর জোর দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি বিশেষভাবে ছোট শিশু, স্বাস্থ্যকর্মী এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডিপথেরিয়ার একটি ভয়াবহ সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডিপথেরিয়া অ্যান্টিটক্সিন সেরাম এবং বেনজাইল পেনিসিলিনের মতো ওষুধগুলো এখন বিরল। ফলে হাসপাতালে ডিপথেরিয়া রোগী এলে তাদের সুস্থতা দান করা কঠিন হয়ে পড়বে। তা ছাড়া হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের চাপে হামের রোগীদের জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমন সময় ডিপথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে হামের পর বাংলাদেশ নতুন আরেকটি সংক্রামক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
যা বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী: সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ডিপথেরিয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত, করণীয় নিয়ে আমরা ভাবছি।