চাঁদাবাজি, খুন, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা কিংবা কিশোর গ্যাং- প্রায় প্রতিটি বড় অপরাধের পেছনেই থাকে অদৃশ্য শক্তি। মাঠের অপরাধীরা ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে আড়ালের গডফাদাররা। স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, অর্থের জোর বা প্রশাসনিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এসব গডফাদার বছরের পর বছর গড়ে তুলে অপরাধের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানী থেকে জেলা শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলেও এখন নানা ধরনের অপরাধের পেছনে আছে কোনো না কোনো অপরাধী সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই বিভিন্ন অভিযানে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের তথ্য দিলেও বড় বড় অপরাধ চক্রের মূল হোতারা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। ফলে অপরাধ থামছে না বরং নতুন নতুন সদস্য যুক্ত হয়ে চক্রগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিগত সময়ে অপরাধ চক্র এতটা জাল বিস্তার করে যা নিয়ে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেকটা ব্যতিব্যস্ত। তবে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু করায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ঢাকায় ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানাবিধ অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন অপরাধে প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তারও হচ্ছে। কোথাও কোথাও বিশেষ অভিযানও চালানো হচ্ছে চাঁদাবাজি, মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে। তারপরও নানা স্থানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হওয়ার খবর আসছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র বলছে, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবারসহ এ ধরনের অপরাধী ও তাদের আশ্রয়- প্রশ্রয়দাতাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে সরকারের নির্দেশে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনী নিজস্ব উদ্যোগে এদের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিতে শুরু করেছেন। রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ও তাদের মদতদাতাদের একাধিক তালিকাও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, একাধিক তালিকা বিশ্লেষণ করে চিহ্নিতদের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, শুধু রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায়ই রয়েছে ৬ থেকে ৭ জন গডফাদার। তাদের অনুসারীদের দিয়ে কাওরান বাজারের বিভিন্ন আড়ত, মার্কেট, ফুটপাথের দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। একইসঙ্গে চুরি-ছিনতাই ও মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ করে তারা। এসব গডফাদারের বেশির ভাগই রাজনৈতিক দলের পরিচয় দিয়ে এসব করছেন। গডফাদারের এই তালিকায় পতিত আওয়ামী লীগ নেতাও রয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি তালিকায় দেখা যায়, শুধু মিরপুরে সাতটি থানা এলাকায় চাঁদা তোলেন ৭২ জন। এসব চাঁদাবাজের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পরিচয় দিয়ে এসব করছেন। তাদের গডফাদার হিসেবে ২৫ জনের নাম এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায়। একইভাবে গাবতলী টার্মিনাল এলাকায় চাঁদাবাজ ও দখলদারদের অনেকের নাম এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পেছনেও বড় ভাই বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। অর্থ, ক্ষমতার প্রদর্শন ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে কিশোরদের এই চক্রে টেনে আনা হচ্ছে। প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী পাওয়া যায় না, আবার কেউ কেউ ভয়ে মুখ খুলতে চান না। অপরাধে জড়িত কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি নেতৃত্বে থাকা গডফাদারদের সংখ্যাও কম নয়। ক্ষমতার পালাবদল হলেও এসব গডফাদাররা খোলস বদলে ফেলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবারিকে ধরতে যাদের ফোন দেয়া হয় তদন্তে দেখা যায় তারাই গডফাদার। কিছু অপরাধী বিদেশে বসে এসব গ্যাংকে নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
সম্প্রতি রাজধানীতে সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পেছনেও অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে এসেছে। কাওরান বাজারে সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোছাব্বির হত্যার পেছনে এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয় জড়িত বলে গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছিল। এ ছাড়া সম্প্রতি নিউ মার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাইম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের নাম আসে। পশুর হাট ইজারা নেয়াকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, তদবিরে কোনো চাঁদাবাজকে ছাড়া হবে না। তালিকা তৈরি করা হয়েছে, সে অনুযায়ী গ্রেপ্তার অভিযান চলবে। এখানে চাঁদাবাজদের অন্য কোনো পরিচয় দেখা হবে না। তিনি বলেন, চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের ছাড়াতে কেউ তদবির করলে ধরে নেয়া হবে সেও চক্রের সঙ্গে জড়িত। চাঁদাবাজ যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে পুলিশ কঠোর অবস্থানে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, দেশের সবক’টি মহানগর এলাকা, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও অন্যান্য ইউনিটকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া চাঁদাবাজির মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করতেও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বচ্ছ তদন্ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অপরাধ জগতের গডফাদারদের চিহ্নিত করা কঠিন। তবে মূলহোতাদের বিচারের আওতায় আনা গেলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসতে পারে। এ ছাড়া শুধু অভিযান চালিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরাধের পেছনে থাকা অর্থের উৎস, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং সামাজিক প্রভাবের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, ছোট অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি নেপথ্যের গডফাদারদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে অপরাধ চক্র ভাঙা সম্ভব হবে না।
ওদিকে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে সরকারের তরফেও স্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে। এমন কাজে জড়িতরা যে দলেরই হোক তাদের গ্রেপ্তার এই আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চাঁদাবাজি, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা যৌথ অভিযান চালাচ্ছি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সঠিকভাবে তালিকা প্রণয়ন করেই অভিযানে নামা হয়েছে।
গতকাল পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী পরিচয় না দেখে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।