রাজধানী ঢাকা এখন বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। দুই সিটি করপোরেশনের পাড়ামহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, মাদকের প্রকাশ্য কেনাবেচা। আর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া চাঁদাবাজির বিষবাষ্পে সাধারণ মানুষের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকা এই অপরাধ সিন্ডিকেটগুলো দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার দাপট, আবর্জনার স্তূপ আর মশার উপদ্রবে জনজীবন অতিষ্ঠ হলেও ওয়ার্ড অফিসগুলোতে সহজে মিলছে না নাগরিক সেবা। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব সমস্যায় জর্জরিত দুই সিটি এখন লাইফ সাপোর্টে।
অলিগলিতে কিশোর গ্যাং এর রাজত্ব : যতই দিন যাচ্ছে আরও বেপরোয়া ও হিংস্র হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। অলিগলিতে এরা এখন মূর্তিমান আতঙ্ক। সর্বত্র চলছে তাদের অঘোষিত রাজত্ব। ছিনতাই থেকে শুরু করে খুনোখুনি, মাদকের ব্যবসা এমনকি চাঁদাবাজিতেও ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের প্রতিযোগিতা চলছে। তাদের হাত থেকে পথচারী থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, কেউই রেহাই পাচ্ছেন না।ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, ঢাকায় ১১৮টি গ্যাং রয়েছে। যাদের সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজার। এলাকা হিসেবে মোহাম্মদপুরে ১৬টি, পল্লবীতে ১৪টি, দারুস সালাম ও বনানীতে ছয়টি করে গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অলিগলিতে আতঙ্ক ছড়ানো গ্যাংগুলোর কাছে দেশি ধারালো অস্ত্র থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে।
মাদকে সয়লাব ঢাকা, বেড়েছে গডফাদার : সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে, ঢাকায় ২৩১ জন মাদকের গডফাদার রয়েছে। পাইকারি ব্যবসায়ী রয়েছে ১ হাজার ১০২ জন ও খুচরা ব্যবসায়ী ২ হাজার ৪৮৯ জন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালে সারা দেশে ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। অথচ ২০২৫ সালে সারা দেশে ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১ পিস ইয়াবা। অর্থাৎ ইয়াবার চালান বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, যেগুলোর বেশির ভাগেরই গন্তব্য ছিল রাজধানী ঢাকা। শুধু ইয়াবাই নয়, গাঁজা, হেরোইন, কোকেন, কুশ, আইস, ফেনসিডিলসহ সব ধরনের মাদকই হাত বাড়ালেই মিলছে। বিভিন্ন পার্ক ও ফ্লাইওভারের নিচে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে এসব মাদক।

উঠতে বসতে চাঁদা, অতিষ্ঠ নগরবাসী : রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর এক বাসিন্দা জানান, তার বাড়ির কাজ করানোর জন্য ট্রাক ভর্তি ইট ও বালু আনা হলে স্থানীয় এক প্রভাবশালীর ভাতিজা সেই ট্রাক থেকে মালামাল নামাতে বাধা দেন। চাঁদা দাবি করেন, দেড় লাখ টাকা। সেই সঙ্গে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড তাদের মাধ্যমে নিতে বলেন। শুধু নির্মাণ নয়, ফুটপাতে দোকান বসানো, অটোরিকশা পরিচালনা, ঝুট কাপড়ের ব্যবসা, বাস-ট্রাকের অবৈধ পার্কিং, ময়লার ব্যবসা, ডিশ ব্যবসা, ভাঙারির দোকান পরিচালনা, সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা কাঁচাবাজারগুলো চাঁদাবাজির অন্যতম খাত হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, যেন উঠতে বসতে চাঁদা দিতে হবে নগরবাসীকে। ডিএমপির বিশেষ অভিযান শুরুর প্রথম ৫ দিনেই ২১০ জন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু এখনো চাঁদাবাজদের বড় কোনো গডফাদার গ্রেপ্তার না হওয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগতে শুরু হয়েছে। জানতে চাইলে ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ থেকে শুরু করে মাদকের লাগাম টানতে আমাদের বিশেষ অভিযান জোরদার রয়েছে। এ ছাড়া টহল কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত চেক পোস্ট পরিচালনা, ব্লক রেইড, সিসি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। অপরাধ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সড়কে ইজিবাইক ও অটোরিকশার দৌরাত্ম্য : রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে ইজিবাইক ও অটোরিকশার দৌরাত্ম্য বেড়েই চলছে। শুধু ঢাকাতেই বর্তমানে ১২ থেকে ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। গত এক বছরে এ সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। আর গ্যারেজের সংখ্যা ১৫ হাজারেরও বেশি। সবচেয়ে বেশি ৯ শতাধিক গ্যারেজ রয়েছে কামরাঙ্গীরচরে। এর পরই রয়েছে মোহাম্মদপুর, উত্তরা, মিরপুর, রামপুরা ও বাড্ডায়। এসব গ্যারেজের মধ্যে কিছু আবার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি করা হচ্ছে অটোরিকশা।
নানা সমস্যায় বেহাল সিটি করপোরেশন : সিটি করপোরেশনে কাউন্সিলর না থাকায় ওয়ার্ড অফিসগুলো যেন ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, উত্তরাধিকার সনদ, চারিত্রিক সনদ এবং নাগরিকত্ব সনদের মতো জরুরি ১৪ ধরনের সেবা পেতে নাগরিকদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আগে যেখানে কাউন্সিলরের এক স্বাক্ষরই যথেষ্ট ছিল, এখন সেখানে প্রশাসনের নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের পেছনে ছুটতে হচ্ছে। একই সঙ্গে নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এখন কেবল প্রধান সড়কগুলোতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অলিগলি থেকে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় ডাস্টবিনগুলো উপচে ময়লা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে। তীব্র গরমে এসব পচা আবর্জনার দুর্গন্ধে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের অনেক বর্ধিত এলাকায় মাসের পর মাস ড্রেন পরিষ্কার না করায় ময়লা জমে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। আসন্ন বর্ষার আগে ড্রেনগুলো সংস্কার করা না হলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।
এ ছাড়া দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকলেও সিটি করপোরেশনগুলোর মশক নিধন কার্যক্রম কার্যত কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। আগে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নিয়মিত ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানো হলেও এখন তা মাঝেমধ্যে দেখা যায়। ফগিং এবং লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ায় মশার উপদ্রব বহু গুণ বেড়ে গেছে। অনেক করপোরেশনের গুদামে পর্যাপ্ত মশার ওষুধ থাকলেও তা প্রয়োগের প্রয়োজনীয় জনবল বা তদারকি নেই। এ ছাড়া রাস্তাঘাট সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ফুটপাত মেরামতের কয়েক শ প্রকল্প এখন মাঝপথে থেমে আছে। বর্তমানে সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর অনেক এলাকা এখন পানিতে তলিয়ে যায়, যা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ। এ ছাড়া এতদিন হকাররা ফুটপাতে থাকলেও এখন তাদের রাস্তায় বসাচ্ছে সিটি করপোরেশন। ফলে সড়কে যানজটের তীব্রতা বেড়েছে। একই সঙ্গে সড়কগুলোতে স্ট্রিট পার্কিং ইজারা দিয়েছে সিটি করপোরেশন।
জানতে চাইলে নগর বিশেষজ্ঞ ও আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা ও স্থানীয় কাউন্সিলর না থাকা এবং শক্তিশালী কমিউনিটি না থাকায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে প্রকাশ্য ছিনতাই ও মাদক বিক্রি, এলাকায় কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি বেড়েছে কয়েক গুণ। আর এগুলোর নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনের সেবাও তলানিতে ঠেকেছে। নাগরিক সেবা, বর্জ্যব্যবস্থাপনা, মশার উপদ্রুব ও জলাবদ্ধতার আকার বেড়েছে। আর ইজিবাইক ও অটোরিকশা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থা নিরসনে তিনি বলেন, পুলিশি টহল বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটি বা সোসাইটিও শক্তিশালী হতে হবে। এ ছাড়া সরকারের ইউনিট অর্থাৎ দ্রুত জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি থাকার ফলে এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পাশাপাশি নাগরিক সেবাও বৃদ্ধি পায়। সার্বিক বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি মনিটরিং টিমও রয়েছে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো লার্ভা জরিপ শুরু করেছে দক্ষিণ সিটি। এ জরিপ হাতে এলে আমরা কার্যক্রম আরও জোড়ালো করতে পারব। তিনি আরও বলেন, পরিচ্ছন্ন কর্মীদের এরই মধ্যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, কোনো রাস্তা যেন অপরিষ্কার না থাকে। তবে পাশাপাশি নাগরিকদেরও আরও সচেতন হতে হবে। অটোরিকশা প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এটার একটা নীতিমালা মন্ত্রণলায় তৈরি করছে। নীতিমালা হয়ে গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, হকার শৃঙ্খলায় আনতে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।