Image description

দেশে হামে মৃত্যুর মিছিল কোনো ক্রমেই থামছে না। আক্রান্তও বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে সাত জনের বেশি শিশু মারা যাচ্ছে। প্রায় দু’মাসে চার শতাধিক শিশু হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। ইতিমধ্যে দেশে হামের টিকা কাভারেজও প্রায় শতভাগ পূরণ হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ১৫ই মার্চ থেকে ১১ই মে পর্যন্ত হামে সন্দেহজনক মৃত্যু হয়েছে ৩৫০ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে মারা গেছে ৬৫ জন। ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশু মারা গেছে। এ সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৪১ জন। এদিকে ৫ই এপ্রিল গতকাল পর্যন্ত হামের টিকার বিভাগওয়ারি ক্যাম্পেইন কাভারেজ শতভাগ। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন এলাকায় এই হার ৯৮ শতাংশ। বিভাগগুলোতে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪টি শিশুকে টিকা দেয়ার টার্গেট নেয়া হয়। গতকাল পর্যন্ত টিকা দেয়া হয়েছে ১ কোটি ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৭৬ জনকে। সিটি করপোরেশনগুলোতে টার্গেট ছিল ১৯ লাখ ৫ হাজার ৯৫০ জন। গতকাল পর্যন্ত টিকা দেয়া হয়েছে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার ৪৪৯ জনকে।

এদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে শনিবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশে হামের টিকার সংকট ও শিশু-মৃত্যুর ঘটনা খতিয়ে দেখছে সরকার। এর পেছনে কোনো অবহেলা আছে কিনা, থাকলে কে দায়ী তা নিশ্চিত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রম শেষ হলে তদন্ত প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রের দায় আছে। এ জন্য সেসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কেন বাচ্চাগুলো হারালাম, কারও কোনো গাফিলতি ছিল কিনা এর তদন্ত হবে।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারিজনিত টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নের কারণে সৃষ্ট রোগ প্রতিরোধ ঘাটতি (ইমিউনিটি গ্যাপ) হামের সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ।

পাশাপাশি শিশু-মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে নিউমোনিয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো এলাকায় টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ সীমার নিচে নেমে গেলে সেখানে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। হাম মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে আক্রান্ত শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক ভিটামিন ‘এ’ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। মির্জা জিয়াউল বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া।

পাশাপাশি শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত জ্বর, খেতে না পারা কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর রোগের ধরন ও অন্যান্য জটিলতা নিরূপণের জন্য ইতিমধ্যে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের অনুরোধ করা হবে। হাম ও হামের উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুর ডেথ রিভিউর বিষয়টি আমরা জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপে (নাইট্যাগ) উপস্থাপন করবো।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, মহামারি দেখা দিলে বিষয়টি আমরা স্বীকার করি না। মহামারি ঘোষণা করি না। কিন্তু মহামারি মোকাবিলায় চেষ্টা করি। অথচ পরিস্থিতি স্বীকার করে কাজ করলে উত্তরণ সহজ হয়। হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিকল্প নেই।

আইইডিসিআর’র উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারাবিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি। দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস থাকবে। তবে মুশকিল হলো, পরিত্রাণের পর আমরা আবার হাম মোকাবিলার কথা ভুলে যাবো।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও ও হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরির সাবেক প্রধান ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি করা সবচেয়ে জরুরি। এতে ইমিউনিটি বাড়ে। আমাদের মধ্যে আবার হামের পুরনো ভাইরাস ফিরে এসেছে। এটা দেশীয় ভাইরাস। ভ্যাকসিনেশন গ্যাপ, ইমিউনিটি গ্যাপ আর ব্রেস্ট ফিডিংয়ের অভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।

হাম উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু: গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একদিনে নতুন করে ১ হাজার ৩৪১ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগে ২ ও ময়মনসিংহে হামের উপসর্গে একজনের মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে গত ১৫ই মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৪১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৫ই মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত মোট ৫০ হাজার ৫০০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ৬ হাজার ৯৩৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ১৫ই মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩৫ হাজার ৯৮০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৩১ হাজার ৯৯২ জন ছাড়পত্র পেয়েছে।