শনিবার সন্ধ্যা ৭টা। রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে মিরপুর-১১ নম্বরে যাওয়ার উদ্দেশে বাসে ওঠেন শাহরিয়ার হাসান। কিন্তু কাজীপাড়া পেরোতেই থেমে যায় বাস। সামনে দীর্ঘ যানজট।
শাহরিয়ার হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় হকার উচ্ছেদের কথা অনেক শুনি, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখি না।
শুধু মিরপুর গোলচত্বর নয়, মিরপুর-১, মিরপুর-২, পল্লবী, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল, লালবাগ, পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে এখন ভয়াবহ যানজট নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত এখন কার্যত হকারদের দখলে। কোথাও কাপড়ের দোকান, কোথাও ফলের ভ্যান, কোথাও চায়ের স্টল—সব মিলিয়ে হাঁটার জায়গা নেই বললেই চলে। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে যানবাহনের গতি কমে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।
পল্লবীর বাসিন্দা হুমায়রা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফুটপাত আর রাস্তা দুটিই হকার আর অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে।
তিনি আরো বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযানের পর কয়েক দিন শান্তি ছিল। এখন আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। ফুটপাত তো দূরের কথা, রাস্তার অর্ধেকও দখল হয়ে গেছে।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অফিস ছুটির পর মিরপুর-১ এলাকায় ফুটপাত দিয়ে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই চিত্র ফার্মগেট, পল্টন, মতিঝিল ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। রাস্তার পাশজুড়ে দোকান বসানোর কারণে যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে। এতে প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযান এখন অনেকটা সাময়িক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। শুরুতে ফুটপাত খালি করা হলেও কিছুদিন পর আবার আগের মতো দখল হয়ে যায়। এতে সিটি করপোরেশনের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অবৈধ পার্কিংয়ে সরু হচ্ছে সড়ক : রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডে সারা দিনই যানজট লেগে থাকে। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ ফুটপাত ও সড়কের বড় অংশ দখল করে রাখায় চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মগবাজার থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত যেতে দ্বিগুণের বেশি সময় লাগে। হাঁটারও সুযোগ নেই। গাড়ির গ্যারেজগুলো রাস্তা আর ফুটপাত দখল করে রাখে। দেখার যেন কেউ নেই।’
গুলিস্তান এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুল বলেন, ‘গুলিস্তানের যানজট কমুক, সেটা মনে হয় সিটি করপোরেশনই চায় না। কারণ রাস্তা দখল করে পার্কিং ও হকার বসা নিয়ন্ত্রণে আনতেই তারা ব্যর্থ। আবার রাস্তার যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা বাসও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।’
গত বৃহস্পতিবার উত্তরা ১, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ ও ১৩ নম্বর সেক্টর ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে রাস্তার দুই ধারে অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের কারণেও কমে গেছে চলাচলের প্রশস্ততা।
৩ নম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর রোডের বাসিন্দা মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোকজন মাঝেমধ্যে দোকান উচ্ছেদ করলেও তাঁরা চলে যাওয়ার পরই আবার দোকান বসে যায়। কিছু ব্যক্তি চাঁদাবাজির মাধ্যমে এসব দোকান বসার সুযোগ করে দিচ্ছেন।’
৬ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘দিনের বেলা রাস্তার দুই ধারে গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়। এসব গাড়ির বেশির ভাগই বাইরের। এর ফলে প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।’
সিটি করপোরেশনের আশ্বাস, সড়কে নেই স্বস্তি : গত মাসে যানজট নিরসনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পুনর্বাসনের কার্যকর পরিকল্পনা না থাকায় উচ্ছেদ হওয়া হকাররা আবারও ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসেছে।
গত ৩০ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মিরপুরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যবসা করা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা ‘হকার কার্ড’ দেওয়া শুরু করে। প্রথম ধাপে ২০২ জন হকারকে এই কার্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ফুটপাত ও সড়ক ছেড়ে নির্ধারিত স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই মিরপুরে আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, যানজট কমাতে এবং ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘আগে হকাররা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুটপাত ও রাস্তা দখল করতেন। এখন থেকে নির্ধারিত স্থানে নির্দিষ্টসংখ্যক হকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বসতে পারবেন। পথচারী ও যান চলাচল নির্বিঘ্ন রেখেই পুনর্বাসনের কাজ করা হচ্ছে।’
ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে হকারদের পুনর্বাসন করা হবে এবং কেউ রাস্তার ওপর ব্যবসা করতে পারবে না। কিছু এলাকায় ঈদ পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছে। তাদের সতর্ক করা হয়েছে নির্ধারিত সময়ের পর সরে যেতে। অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘যানজট নিরসন ও পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার কাজ চলছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়, নগরবাসীকেও সহযোগিতা করতে হবে।’