গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক ডাক বাংলোর একটি সরকারি জমি লিজ দেওয়া হবে। এ বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তির সঙ্গে নিজ কক্ষে বসে আলাপ করছিলেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. নজরুল ইসলাম। এ সময় সিইও ওই ব্যক্তিকে বলছিলেন, ‘সময় বেশি নেই, এক সপ্তাহের মধ্যে তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। এক কোটির দরকার নেই, আপনি ৮০ লাখ টাকায় ফাইনাল করবেন।
গত ২৪ মার্চের ওই ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ কালের কণ্ঠের হাতে আসে। ওই ভিডিওতে সিইও নজরুল ইসলামকে উল্লিখিত কথাগুলো বলতে শোনা যায়। এরপর অনুসন্ধানে জানা যায়, সেদিন দুপুর সোয়া ১টায় জমি লিজের বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিকে এভাবেই ঘুষের অঙ্ক বলে দেন সিইও।
ভিডিওতে সিইও নজরুলকে আরো বলতে শোনা যায়, ‘খুব দ্রুত প্রশাসক নিয়োগ হয়ে যাবে। এই প্রশাসক হবে পলিটিক্যাল, বিএনপির প্রশাসক। আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটা স্যাটেল ছিল, তাদের যেকোনো বিষয় বোঝানো যেত। কিন্তু বিএনপির প্রশাসককে বোঝানো যাবে না।সরকারি জমি লিজের নামে এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষের অঙ্ক নির্ধারণের ওই ভিডিও ফুটেজ পাওয়ার পর এ বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে কালের কণ্ঠ। দর-কষাকষি হলেও সেই জমিটি শেষ পর্যন্ত লিজ দেওয়া হয়নি। তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে তাঁর একাধিক লিজ-কাণ্ডের ঘটনা।
তেমনই একটি হলো গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ঘটনা। নিয়মের তোয়াক্কা না করেই একটি সোয়েটার কারখানাকে ১৫ শতাংশ জমি লিজ দিয়েছেন সিইও।
জানা গেছে, ইসলামপুর মৌজার আর এস খতিয়ান নম্বর ২ এবং ৯৭৬ নম্বর দাগে জেলা পরিষদের ১.৬৫ একর জমি রয়েছে। সেখানে দুই বছর ধরে প্রায় ১৫ শতাংশ জমি দখল করে সীমানাপ্রাচীর, ফটক, গাড়ি রাখার শেড নির্মাণ করেছে তিনা সোয়েটার গার্মেন্টস নামে একটি কারখানা।
সরেজমিনে গেলে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরাও জেলা পরিষদের এই জমি দখল করে রাখার বিষয়টি স্বীকার করেন। তাঁরা জানান, গত ৫ জানুয়ারি জেলা পরিষদের সিও নজরুল ইসলাম সরেজমিনে তিনা গার্মেন্টসের দখলে থাকা জমি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষকে শাসিয়েও আসেন। এমনকি সরকারি আইন অনুযায়ী মামলা করার বিষয়টিও জানিয়ে আসেন। যথারীতি সীমানাপ্রাচীরে একটি উচ্ছেদের নোটিশও টানিয়ে দেন।
এ পর্যন্ত সবই ঠিক। সরকারি নিয়ম মেনেই করেছেন সবকিছু। কিন্তু সরকারি অনুশাসন পালনের আড়ালে ভেতরে চলে আরেক খেলা। সরেজমিনে ওই পদক্ষেপগুলোর পর কারখানা কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করলে প্রথমে ভয়ভীতি দেখান সিইও। তারপর নিজ কক্ষেই বসে দেন-দরবার। শেষ পর্যন্ত ৩০ লাখ টাকায় রফা হয়। এরপর আইনের অনুশাসন ভুলে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ওই কারখানার দখলবাজিকে অফিশিয়াল স্বীকৃতি দিয়ে দেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরেজমিন পরিদর্শনের প্রায় দুই মাস পর গত ৩ মার্চ দখল হওয়া ওই জমিটি লিজের একটি ফাইল তৈরি হয়। ওই কারখানার মালিক রায়হান আহমেদ খানের নামে এক বছরের জন্য জমিটি লিজ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে এসংক্রান্ত একটি ফাইল পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, ৯৭৬ নম্বর দাগে ৬ হাজার ৮০০ বর্গফুট অর্থাৎ প্রায় ১৫ শতাংশের বেশি জায়গা লিজ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জেলা পরিষদ ফরম নম্বর ৮ এবং চালান ৫৯০৫ নম্বরে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে গত ১৫ মার্চ ৬৮ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়। প্রতি বর্গফুট জায়গার ভাড়া মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা হারে।
জেলা পরিষদের জায়গা লিজসংক্রান্ত গেজেট অনুযায়ী, জায়গা লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাড়া নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে এবং উক্ত কমিটি জমির ভাড়ার মূল্য নির্ধারণ করবে। এই জমির ক্ষেত্রে আইনের তোয়াক্কা করেননি সিইও নজরুল ইসলাম।
গেজেটে আরো বলা আছে, জেলা পরিষদের জায়গা দখলে থাকমে প্রথমে তা উচ্ছেদ করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য তা লিজ দিতে হবে। জেলা পরিষদের সিইও নজরুল ইসলাম এই জায়গা পরিদর্শনের আগেই সেখানে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণসহ বিভিন্ন স্থাপনা ছিল। অথচ আগে উচ্ছেদ না করে টাকার বিনিময়ে ওই কারখানাকে ‘বৈধতা’ দিয়ে দেন।
গত ৪ মে সরেজমিনে ওই এলাকায় যান কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক। ওই কারখানার হিসাব কর্মকর্তা ছানোয়ার রহমানের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দিয়ে লিজ নিয়েছেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, সেখানে থাকা অবস্থায়ই জেলা পরিষদের সিইও নজরুল ইসলাম প্রতিবেদকের ফোনে কল দেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদক নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে, উল্টো সিইও নিজেই তিনা সোয়েটার কারখানাতে কোন সমস্যা আছে কি না জানতে চান। এমনকি ওই কারখানা কর্তৃপক্ষই সিইওকে কালের কণ্ঠের সাংবাদিকের মোবাইল নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেছেন বলেও স্বীকার করেন তিনি। টাকার বিনিময়ে জায়গা লিজ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অফিসে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
এরপর একই দিন জেলা পরিষদ কার্যালয়ে সরাসরি গিয়ে জানতে চাইলে সিইও বলেন, ওই জায়গা কারখানাকে লিজ দেওয়া হয়েছে। উচ্ছেদ নোটিশ টানিয়ে সেখানে উচ্ছেদ না করে জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো নিয়ম আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো লিজ ফাইল সম্পূর্ণ করা হয়নি। আপনি বললে বাতিল করে দেব। এ সময় তিনি বলেন, এই অফিসে অনেক অনিয়ম হয়ে থাকে। কর্মচারীরা বিভিন্ন জায়গায় আমাকে বিক্রি করে থাকে। লিজের বিষয়ে আর্থিক লেনদেনের দোষারোপ তিনি সাবেক সার্ভেয়ার রেজোয়ানের ওপর চাপিয়ে দেন।
অনেক ঘুরিয়েফিরিয়ে শেষ পর্যন্ত লিজ বাতিল করে দেওয়া হবে বলে জানান সিইও। তিনি বলেন, ‘ভাই সমাধান করেন, লিজ বাতিল করে দিই।’
গরু বেচে দুই লাখ টাকা ঘুষ
এদিকে জেলা পরিষদের আওতাধীন শ্রীপুর উপজেলার বরমী খেয়াঘাট লিজ দেওয়ার নামে তমিজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তমিজ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এই খেয়াঘাট লিজ নিয়ে চালিয়েছি। গত লিজের টেন্ডার গোপনে দেওয়ার কারণে পাইনি। পরবর্তী সময়ে খেয়া পারাপারে সরকার নির্ধারিত তিন টাকার পরিবর্তে পাঁচ টাকা আদায় করা হলে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আমি সিইও বরাবর অভিযোগ করি। পরে অভিযোগের ভিত্তিতে ৬ জানুয়ারি ঘাট পরিদর্শন করেন সিইও।’
এরপর অফিসে গেলে তাঁর কাছে সিইও সরাসরি ঘুষ চান বলে অভিযোগ করেন তমিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি অফিসে গেলে সিইও বলেন, এখন যদি আপানকে ঘাট দিই, আমাকে কী দেবেন? এ সময় তিনি ছয় লাখ টাকা দাবি করলে আমি গরু বিক্রি করে তাঁকে দুই লাখ টাকা দিয়ে আসি। কিন্তু টাকা নিলেও পরবর্তী সময়ে আমার বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি। বর্তমানে টাকার জন্য উনার কাছে গেলেও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন।’
ঘরে উঠতেই লাখ টাকার কমোড
আরো অভিযোগ রয়েছে, মাত্র সাড়ে চার মাস ধরে তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে উঠলেও ইতিমধ্যে কয়েক লাখ টাকার কাজ করিয়ে নিয়েছেন। প্রতিবার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেই নতুন করে কয়েক লাখ টাকার সংষ্কার ও মেরামত করানো হয়। সম্প্রতি সিইও নজরুল ইসলামের বাসভবনে তিন লাখ ৯০ হাজার ৫০০ টাকার একটি বিলের ভাওচারের কপি হাতে আসে প্রতিবেদকের। সেখানে দেখা যায়, তিনি তাঁর বাসভবনে ৬৫ হাজার টাকা মূলের একটি বেসিন এবং লাখ টাকার একটি উন্নতমানের কমোড বসিয়েছেন। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেই পূর্বের সিইও কমোড ও বেসিন পরিবর্তন করেছেন।
একই বিলে তিনি বাসভবন এবং বাউন্ডারি ওয়াল রং করার জন্য এক লাখ ৯৬ হাজার টাকা ভাউচার করেন। সরকারি নিয়ম রয়েছে ৬০ হাজার টাকার বেশি কোনো কাজের ভাউচার করা যাবে না। তিন লাখের বেশি কোনো কাজ করানো হলে টেন্ডারের মাধ্যমে করাতে হবে। তবে প্রায় চার লাখ টাকার কাজ করিয়ে তিনি কার্য সহকারী শামীম ইকবালের নামে বিল পরিশোধ করা যেতে পারে এমন প্রস্তাব করেন। এভাবে ভুয়া ভাউচারের নামেও তিনি অর্থ আত্মসাৎ করেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা পরিষদের সিইও নজরুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অভিযোগ আসলে ব্যক্তি বিশেষে হয়। আমরা যেহেতু অনেক কাজের উদ্যোগ নিয়েছি, সেহেতু অনেকে অনেক কিছু বলবে; তবে এসব অভিযোগ সত্য নয়।
এদিকে একাধিক গুরুতর অভিযোগের পরও এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এই প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠছে, এত অভিযোগের পরও কেন নীরব প্রশাসন?
জানা গেছে, গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর শরীয়তপুর থেকে বদলি হয়ে গাজীপুর জেলা পরিষদে যোগদান করেন মো. নজরুল ইসলাম। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।